Islamic Story
রুমা কূপের ঐতিহাসিক দান: হযরত উসমান (রা.)-এর পরোপকারের এক অমর দৃষ্টান্ত
Can The Well of Rumah change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens faith.
গল্পের শিক্ষা
উসমান (রাঃ)-এর বি’রে রুমা ক্রয়ের ঘটনা থেকে শিক্ষা মেলে যে, ব্যক্তিগত সম্পদকে জনকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করাই প্রকৃত সফলতা। সংকটের সময় ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে উম্মাহর পাশে দাঁড়ানো এবং বিনিময়ে কেবল জান্নাত ও আল্লাহর ওয়াদা আশা করা একজন মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।
Beginning
ইসলামের ইতিহাসে উসমান ইবন আফফান (রাঃ) এক অনন্য নক্ষত্র, যিনি তাঁর বিনয়, লজ্জা এবং আল্লাহর পথে অকাতরে সম্পদ ব্যয়ের জন্য ‘জুন-নুরাইন’ ও ‘গণি’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। মক্কার কুরাইশ বংশের বিত্তশালী এই সাহাবী প্রথম দিকেই ইসলাম কবুল করেন এবং আমৃত্যু ইসলামের কল্যাণে নিজের সমস্ত সামর্থ্য বিলিয়ে দেন। তাঁর এই বিশাল অবদানের অন্যতম এক উজ্জ্বল অধ্যায় হলো মদিনায় হিজরতের পরবর্তী সময়ে ‘বি’রে রুমা’ বা রুমা কূপ ক্রয়।
সাহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী (হাদিস নং: ২৭৭৮, ৩৬৯৯), এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি চিরস্থায়ী সদকায়ে জারিয়া। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে যখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরাম মক্কার বৈরী পরিবেশ ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন, তখন সেখানে পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। মদিনার একমাত্র মিষ্টি পানির উৎস ছিল ‘বি’রে রুমা’ নামক একটি গভীর কূপ।
তৎকালীন সময়ে এই কূপটির মালিক ছিল বনু গিফার গোত্রের একজন ব্যক্তি (মতান্তরে একজন ইহুদি)। সেই ব্যক্তি অত্যন্ত চড়ামূল্যে মদিনাবাসীর কাছে পানি বিক্রি করত। অভাবী মুহাজির ও স্থানীয় আনসারদের পক্ষে প্রতিদিন চড়া দামে পানি কিনে জীবন ধারণ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল।
মুহাজিররা মক্কায় তাদের সর্বস্ব রেখে এসেছিলেন, তাই এই সংকট তাদের জন্য প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। ইবনে কাসির তাঁর ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (৭ম খণ্ড) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মদিনায় সুপেয় পানির অভাব এতই প্রকট ছিল যে মানুষ তৃষ্ণায় হাহাকার করছিল। সংকট নিরসনে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) একটি ঘোষণা জারি করলেন।
The Test
তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি বি’রে রুমা ক্রয় করে তার বালতিটি সাধারণ মুসলমানদের বালতির সাথে শামিল করবে (অর্থাৎ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করবে), সে জান্নাতে এর চেয়েও উত্তম কূপ লাভ করবে।” রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর এই ঘোষণার প্রতি সাড়া দিতে উসমান (রাঃ) এক মুহূর্ত দেরি করেননি। তিনি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদের বিনিময়ে জান্নাতের সেই উচ্চতর প্রতিদানের আশায় সেই কূপের মালিকের নিকট গমন করেন। দাতা হিসেবে তিনি তাঁর সম্পদকে কেবল ব্যক্তিগত বিলাসিতার বস্তু হিসেবে নয়, বরং উম্মাহর আমানত হিসেবে গণ্য করতেন।
মালিক পুরো কূপটি একযোগে বিক্রি করতে অস্বীকার করলে উসমান (রাঃ) তাঁর অসাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তার সাথে কূপের অর্ধেক অংশ বা মালিকানা ক্রয়ের প্রস্তাব দেন। একটি নির্দিষ্ট সুউচ্চ মূল্যের বিনিময়ে চুক্তি হলো যে, একদিন কূপটির মালিকানা থাকবে উসমান (রাঃ)-এর কাছে এবং পরবর্তী দিন থাকবে আগের মালিকের কাছে। উসমান (রাঃ) তাঁর জন্য নির্ধারিত দিনে ঘোষণা করে দিলেন যে, মদিনার সকল মুসলিম ও অমুসলিম অধিবাসী আজ বিনামূল্যে পানি সংগ্রহ করতে পারবে।
মানুষ উসমানের নির্ধারিত দিনে এসে দুই দিনের প্রয়োজনীয় পানি একদম বিনামূল্যে সংগ্রহ করে নিয়ে যেত। ফলে পরবর্তী দিন যখন মূল মালিকের পালা আসত, তখন কেউ আর চড়ামূল্যে পানি কিনতে আসত না। কারণ তাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুত থাকত।
এভাবে কূপের অপর মালিক যখন দেখল যে তার ব্যবসায়িক লাভ আর অবশিষ্ট নেই, তখন সে বাকি অর্ধেক মালিকানাও উসমান (রাঃ)-এর কাছে বিক্রি করতে সম্মত হলো। উসমান ইবন আফফান (রাঃ) বিশাল অংকের অর্থের বিনিময়ে পুরো কূপটি কিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সদকা বা ওয়াকফ করে দেন। ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (৭ম খণ্ড) অনুসারে, এই উৎসর্গ ছিল নিঃস্বার্থ এবং এটি কেয়ামত অবধি মুসলিমদের জন্য এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
উসমান (রাঃ)-এর দানশীলতা কেবল পানির কূপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মদিনায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে মসজিদে নববীর সংকুলান হচ্ছিল না। সাহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী (হাদিস নং: ২৪০১), রাসুল (সাঃ) যখন মসজিদ সম্প্রসারণের ঘোষণা দেন, তখনও উসমান (রাঃ) নিজ অর্থে পার্শ্ববর্তী জমি ক্রয় করে তা মসজিদের জন্য দান করেন।
তাঁর এই দান ছিল সুদূরপ্রসারী, যা বর্তমানের বিশাল মসজিদে নববীর ভিত্তিকে প্রশস্ত করেছিল। নবী করীম (সাঃ) যখনই উম্মাহর কোনো সংকটে সাহায্যের আহ্বান জানাতেন, উসমান (রাঃ) সেখানেই প্রথম কাতারে থাকতেন। ৯ম হিজরিতে ইসলামের সবচেয়ে কঠিনতম সময় তবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি বা ‘জাইশুল উসরা’ (কষ্টের সেনাবাহিনী) এর সময় হযরত উসমান (রাঃ) যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা ইতিহাসে বিরল।
মদিনায় তখন প্রচণ্ড খরা, ফসল কাটার মৌসুম এবং দীর্ঘ মরুপথের সফরের জন্য পর্যাপ্ত রসদ ছিল না। এ অভিযানে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল বিপুল। সাহিহ বুখারি (হাদিস ২৭৭৮) এবং আল-বিদায়াতে বর্ণিত আছে যে, উসমান (রাঃ) তৎকালীন সময়ে ১০০০ উট, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা এবং যুদ্ধের সামগ্রী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হন।
The Lesson
সাহিহ বুখারির বর্ণনায় পাওয়া যায়, তাঁর এই অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ দেখে নবী কারীম (সাঃ) অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাঁর হাতের মুদ্রাসমূহ নাড়াচাড়া করতে করতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আজকের পর উসমান যা-ই করুক না কেন, তা তাঁর কোনো ক্ষতি করবে না।” অর্থাৎ তাঁর এই একটি আমলই তাঁর আখেরাতের সাফল্যের জন্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট ছিল। উসমান (রাঃ)-এর জীবন দর্শন ছিল ইহকালীন সম্পদের বিনিময়ে পরকালীন অক্ষয় জান্নাত নিশ্চিত করা। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন যে, উসমান (রাঃ) তাঁর সমগ্র জীবনে অসংখ্য দাসকে মুক্ত করেছেন এবং ইসলামের প্রতিটি সংকটে নিজের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
বি’রে রুমার সেই পবিত্র পানি আজও মদিনার বুকে উসমান (রাঃ)-এর বদান্যতার সাক্ষ্য বহন করছে যা শতাব্দী ধরে সাধারণের সেবায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক সৌদি আরবেও উসমান (রাঃ)-এর নামে সেই ওয়াকফ সম্পত্তি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়, যা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন চলমান চ্যারিটি স্কিম। তাঁর এই ওয়াকফ আজও হাজার হাজার মানুষকে উপকৃত করছে, যা ইসলামের সামাজিক অর্থনৈতিক দর্শনের এক অনন্য সৌন্দর্য।
উসমান (রাঃ)-এর চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর গভীর আল্লাহভীতি। অগাধ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। সাহিহ মুসলিমের (হাদিস ২৪০১) বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাঁর লজ্জাশীলতা ছিল এমন যে স্বয়ং ফেরেশতারাও তাঁকে দেখে লজ্জা বোধ করতেন।
আল্লাহর দ্বীনের জন্য তিনি যে কেবল সম্পদ দিয়েছেন তা নয়, বরং হিজরত থেকে শুরু করে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালন পর্যন্ত তিনি নিজের জীবন তিল তিল করে উৎসর্গ করেছেন। পরিশেষে, উসমান ইবন আফফান (রাঃ) আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, ব্যক্তিগত সম্পদের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার হলো সমাজ ও উম্মাহর কল্যাণে তা উৎসর্গ করা। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, অন্যদিকে ছিলেন আল্লাহর ভয়ে সদা কম্পমান এক জান্নাতী মহামানব।
বি’রে রুমা থেকে শুরু করে তবুক যুদ্ধের রসদ যোগান—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন যে পার্থিব ধন-সম্পদ মুমিনের কাছে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার সরঞ্জাম নয়, বরং জান্নাতের পথ প্রশস্ত করার মাধ্যম। ইসলামের ইতিহাসে তিনি এমন এক নিঃস্বার্থ দাতা, যাঁর মর্যাদা জান্নাতী সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের মধ্যে বিশেষভাবে চিহ্নিত। তাঁর জীবনের এই ত্যাগ আধুনিক ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা ও জনসেবামূলক কাজের চিরন্তন অনুপ্রেরণা এবং কিয়ামত পর্যন্ত আসা মুসলিমদের জন্য ত্যাগের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা।
ইসলামের ইতিহাসে উসমান ইবন আফফান (রাঃ) এক অনন্য নক্ষত্র, যিনি তাঁর বিনয়, লজ্জা এবং আল্লাহর পথে অকাতরে সম্পদ ব্যয়ের জন্য ‘জুন-নুরাইন’ ও ‘গণি’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। মক্কার কুরাইশ বংশের বিত্তশালী এই সাহাবী প্রথম দিকেই ইসলাম কবুল করেন এবং আমৃত্যু ইসলামের কল্যাণে নিজের সমস্ত সামর্থ্য বিলিয়ে দেন। তাঁর এই বিশাল অবদানের অন্যতম এক উজ্জ্বল অধ্যায় হলো মদিনায় হিজরতের পরবর্তী সময়ে ‘বি’রে রুমা’ বা রুমা কূপ ক্রয়।
সাহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী (হাদিস নং: ২৭৭৮, ৩৬৯৯), এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি চিরস্থায়ী সদকায়ে জারিয়া। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে যখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরাম মক্কার বৈরী পরিবেশ ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন, তখন সেখানে পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। মদিনার একমাত্র মিষ্টি পানির উৎস ছিল ‘বি’রে রুমা’ নামক একটি গভীর কূপ।
তৎকালীন সময়ে এই কূপটির মালিক ছিল বনু গিফার গোত্রের একজন ব্যক্তি (মতান্তরে একজন ইহুদি)। সেই ব্যক্তি অত্যন্ত চড়ামূল্যে মদিনাবাসীর কাছে পানি বিক্রি করত। অভাবী মুহাজির ও স্থানীয় আনসারদের পক্ষে প্রতিদিন চড়া দামে পানি কিনে জীবন ধারণ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল।
মুহাজিররা মক্কায় তাদের সর্বস্ব রেখে এসেছিলেন, তাই এই সংকট তাদের জন্য প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। ইবনে কাসির তাঁর ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (৭ম খণ্ড) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মদিনায় সুপেয় পানির অভাব এতই প্রকট ছিল যে মানুষ তৃষ্ণায় হাহাকার করছিল। সংকট নিরসনে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) একটি ঘোষণা জারি করলেন।
The Test
তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি বি’রে রুমা ক্রয় করে তার বালতিটি সাধারণ মুসলমানদের বালতির সাথে শামিল করবে (অর্থাৎ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করবে), সে জান্নাতে এর চেয়েও উত্তম কূপ লাভ করবে।” রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর এই ঘোষণার প্রতি সাড়া দিতে উসমান (রাঃ) এক মুহূর্ত দেরি করেননি। তিনি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদের বিনিময়ে জান্নাতের সেই উচ্চতর প্রতিদানের আশায় সেই কূপের মালিকের নিকট গমন করেন। দাতা হিসেবে তিনি তাঁর সম্পদকে কেবল ব্যক্তিগত বিলাসিতার বস্তু হিসেবে নয়, বরং উম্মাহর আমানত হিসেবে গণ্য করতেন।
মালিক পুরো কূপটি একযোগে বিক্রি করতে অস্বীকার করলে উসমান (রাঃ) তাঁর অসাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তার সাথে কূপের অর্ধেক অংশ বা মালিকানা ক্রয়ের প্রস্তাব দেন। একটি নির্দিষ্ট সুউচ্চ মূল্যের বিনিময়ে চুক্তি হলো যে, একদিন কূপটির মালিকানা থাকবে উসমান (রাঃ)-এর কাছে এবং পরবর্তী দিন থাকবে আগের মালিকের কাছে। উসমান (রাঃ) তাঁর জন্য নির্ধারিত দিনে ঘোষণা করে দিলেন যে, মদিনার সকল মুসলিম ও অমুসলিম অধিবাসী আজ বিনামূল্যে পানি সংগ্রহ করতে পারবে।
মানুষ উসমানের নির্ধারিত দিনে এসে দুই দিনের প্রয়োজনীয় পানি একদম বিনামূল্যে সংগ্রহ করে নিয়ে যেত। ফলে পরবর্তী দিন যখন মূল মালিকের পালা আসত, তখন কেউ আর চড়ামূল্যে পানি কিনতে আসত না। কারণ তাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুত থাকত।
এভাবে কূপের অপর মালিক যখন দেখল যে তার ব্যবসায়িক লাভ আর অবশিষ্ট নেই, তখন সে বাকি অর্ধেক মালিকানাও উসমান (রাঃ)-এর কাছে বিক্রি করতে সম্মত হলো। উসমান ইবন আফফান (রাঃ) বিশাল অংকের অর্থের বিনিময়ে পুরো কূপটি কিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সদকা বা ওয়াকফ করে দেন। ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (৭ম খণ্ড) অনুসারে, এই উৎসর্গ ছিল নিঃস্বার্থ এবং এটি কেয়ামত অবধি মুসলিমদের জন্য এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
উসমান (রাঃ)-এর দানশীলতা কেবল পানির কূপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মদিনায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে মসজিদে নববীর সংকুলান হচ্ছিল না। সাহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী (হাদিস নং: ২৪০১), রাসুল (সাঃ) যখন মসজিদ সম্প্রসারণের ঘোষণা দেন, তখনও উসমান (রাঃ) নিজ অর্থে পার্শ্ববর্তী জমি ক্রয় করে তা মসজিদের জন্য দান করেন।
তাঁর এই দান ছিল সুদূরপ্রসারী, যা বর্তমানের বিশাল মসজিদে নববীর ভিত্তিকে প্রশস্ত করেছিল। নবী করীম (সাঃ) যখনই উম্মাহর কোনো সংকটে সাহায্যের আহ্বান জানাতেন, উসমান (রাঃ) সেখানেই প্রথম কাতারে থাকতেন। ৯ম হিজরিতে ইসলামের সবচেয়ে কঠিনতম সময় তবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি বা ‘জাইশুল উসরা’ (কষ্টের সেনাবাহিনী) এর সময় হযরত উসমান (রাঃ) যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা ইতিহাসে বিরল।
মদিনায় তখন প্রচণ্ড খরা, ফসল কাটার মৌসুম এবং দীর্ঘ মরুপথের সফরের জন্য পর্যাপ্ত রসদ ছিল না। এ অভিযানে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল বিপুল। সাহিহ বুখারি (হাদিস ২৭৭৮) এবং আল-বিদায়াতে বর্ণিত আছে যে, উসমান (রাঃ) তৎকালীন সময়ে ১০০০ উট, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা এবং যুদ্ধের সামগ্রী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হন।
The Lesson
সাহিহ বুখারির বর্ণনায় পাওয়া যায়, তাঁর এই অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ দেখে নবী কারীম (সাঃ) অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাঁর হাতের মুদ্রাসমূহ নাড়াচাড়া করতে করতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আজকের পর উসমান যা-ই করুক না কেন, তা তাঁর কোনো ক্ষতি করবে না।” অর্থাৎ তাঁর এই একটি আমলই তাঁর আখেরাতের সাফল্যের জন্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যথেষ্ট ছিল। উসমান (রাঃ)-এর জীবন দর্শন ছিল ইহকালীন সম্পদের বিনিময়ে পরকালীন অক্ষয় জান্নাত নিশ্চিত করা। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন যে, উসমান (রাঃ) তাঁর সমগ্র জীবনে অসংখ্য দাসকে মুক্ত করেছেন এবং ইসলামের প্রতিটি সংকটে নিজের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
বি’রে রুমার সেই পবিত্র পানি আজও মদিনার বুকে উসমান (রাঃ)-এর বদান্যতার সাক্ষ্য বহন করছে যা শতাব্দী ধরে সাধারণের সেবায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক সৌদি আরবেও উসমান (রাঃ)-এর নামে সেই ওয়াকফ সম্পত্তি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়, যা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন চলমান চ্যারিটি স্কিম। তাঁর এই ওয়াকফ আজও হাজার হাজার মানুষকে উপকৃত করছে, যা ইসলামের সামাজিক অর্থনৈতিক দর্শনের এক অনন্য সৌন্দর্য।
উসমান (রাঃ)-এর চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর গভীর আল্লাহভীতি। অগাধ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। সাহিহ মুসলিমের (হাদিস ২৪০১) বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাঁর লজ্জাশীলতা ছিল এমন যে স্বয়ং ফেরেশতারাও তাঁকে দেখে লজ্জা বোধ করতেন।
আল্লাহর দ্বীনের জন্য তিনি যে কেবল সম্পদ দিয়েছেন তা নয়, বরং হিজরত থেকে শুরু করে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালন পর্যন্ত তিনি নিজের জীবন তিল তিল করে উৎসর্গ করেছেন। পরিশেষে, উসমান ইবন আফফান (রাঃ) আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, ব্যক্তিগত সম্পদের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার হলো সমাজ ও উম্মাহর কল্যাণে তা উৎসর্গ করা। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, অন্যদিকে ছিলেন আল্লাহর ভয়ে সদা কম্পমান এক জান্নাতী মহামানব।
বি’রে রুমা থেকে শুরু করে তবুক যুদ্ধের রসদ যোগান—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন যে পার্থিব ধন-সম্পদ মুমিনের কাছে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার সরঞ্জাম নয়, বরং জান্নাতের পথ প্রশস্ত করার মাধ্যম। ইসলামের ইতিহাসে তিনি এমন এক নিঃস্বার্থ দাতা, যাঁর মর্যাদা জান্নাতী সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের মধ্যে বিশেষভাবে চিহ্নিত। তাঁর জীবনের এই ত্যাগ আধুনিক ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা ও জনসেবামূলক কাজের চিরন্তন অনুপ্রেরণা এবং কিয়ামত পর্যন্ত আসা মুসলিমদের জন্য ত্যাগের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা।