Islamic Story

কাব ইবনে মালিকের তওবা: ভুল স্বীকার ও আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার সুসংবাদ

Can The Triumph of Truth change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens fa.

কাব ইবনে মালিকের তওবা: ভুল স্বীকার ও আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার সুসংবাদ

গল্পের শিক্ষা

সত্যবাদিতা মানুষকে মুক্তি দেয় আর মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করে। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং কঠিন সময়েও সত্যের ওপর অটল থাকাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

Beginning

তাবুক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাব বিন মালিক (রা.)-এর সত্যবাদিতা ও তওবা কবুল হওয়ার ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে নেফাক ও ইখলাসের মধ্যকার পার্থক্যের এক অবিস্মরণীয় উপাখ্যান। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা আত-তাওবার ১১৭ ও ১১৮ নম্বর আয়াতে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। খ্রিষ্টীয় ৬৩০ অব্দে যখন রোমান বাহিনীর মুকাবেলায় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাবুক অভিযানের ডাক দেন, তখন আরবে চলছিল অসহনীয় প্রচণ্ড উত্তাপ।

দীর্ঘ পথ অতিক্রমের ক্লান্তি এবং মদিনার খেজুর বাগানের ফল পাকার সুবর্ণ সময় হওয়া সত্ত্বেও মুমিনরা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে দ্বিধা করেননি। সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৪১৮) ও সহীহ মুসলিমের (হাদীস নং ২৭৬৯) দীর্ঘ বর্ণনায় কাব বিন মালিক (রা.) নিজেই এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তাবুক যুদ্ধের আগ পর্যন্ত তার আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা ইতঃপূর্বে কখনোই এত ভালো ছিল না।

তাঁর কাছে যুদ্ধের জন্য সুসজ্জিত দুটি বাহন পর্যন্ত মজুদ ছিল। কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় তিনি প্রতিদিন মনে মনে ভাবতেন, 'কালই তো সব গুছিয়ে নেব, আমি তো সামর্থ্যবান'। এভাবে আলস্য ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে একদিন তিনি আবিষ্কার করলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং মুসলিম বাহিনী মদিনা ত্যাগ করে অনেক দূর চলে গেছেন।

সাহাবী কাব বিন মালিক যখন মদিনায় নিজেকে একাকী দেখলেন, তখন তাঁর মনে প্রচণ্ড অনুশোচনা জাগতে লাগল। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, যারা যুদ্ধে না গিয়ে মদিনায় রয়ে গেছে, তারা হয় প্রকাশ্য মুনাফিক অথবা অক্ষম শারীরিক প্রতিবন্ধী। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাবুক পৌঁছানোর পর কাব বিন মালিকের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করে তাঁর সম্পর্কে জানতে চান।

The Test

এসময় বনু সালিমা গোত্রের এক ব্যক্তি কাবকে নিয়ে কটূক্তি করলে বীর সাহাবী মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) তাঁর পক্ষ নিয়ে বলেন, 'আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কাব সম্পর্কে কেবল কল্যাণই জানি।' যুদ্ধ জয় শেষে রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন, তিনি প্রথা অনুযায়ী মসজিদে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। এরপর প্রায় আশিজন মুনাফিক মিথ্যা শপথ করে করে তাদের অনুপস্থিতির জঘন্য ওজর পেশ করতে শুরু করে।
দয়ার নবী মুহাম্মদ (সা.) তাদের বাহ্যিক অজুহাত গ্রহণ করে তাদের অন্তরের বিষয় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু যখন কাব বিন মালিকের পালা এলো, তিনি জানতেন যে সত্য বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তিনি রাসূল (সা.)-এর সামনে দাঁড়িয়ে অকপটে স্বীকার করলেন, 'হে আল্লাহর নবী, আল্লাহর কসম!

আমার কোনো ওজর ছিল না। আমি সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও অবহেলাবশত পিছিয়ে পড়েছিলাম।' রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর এই অটল সত্যবাদিতা লক্ষ্য করে বললেন, 'এই ব্যক্তিটি সত্য বলেছে।' এরপর নবী (সা.) তাঁকে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করতে আদেশ দিলেন। কাব বিন মালিকের সাথে সাথে আরও দুইজন প্রবীণ সাহাবী—হিলাল বিন উমাইয়া এবং মুরারা বিন রাবিও সত্য স্বীকার করেন।

এরপর শুরু হলো এক অবর্ণনীয় পরীক্ষার কাল। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা দিলেন যে, এই তিনজনের সাথে কোনো মুসলিম কোনো প্রকার কথা বলবে না। দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন ব্যাপী এক কঠোর সামাজিক বয়কট শুরু হলো।

এই দিবসগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে কাসীর তাঁর 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' গ্রন্থে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছেন। কাব বিন মালিকের জন্য বিশাল পৃথিবী সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ল। তাঁর নিজ গৃহ ও আত্মীয়স্বজন সবই যেন অপরিচিত হয়ে গেল।

The Lesson

এমনকি তাঁর নিজের চাচাতো ভাই এবং পরম প্রিয় বন্ধু আবু কাতাদাহর কাছে গিয়েও তিনি যখন সালাম দিলেন, তখন তিনি সালামের উত্তর পর্যন্ত দেননি এবং মহানবী (সা.)-এর নির্দেশের সম্মানে নিশ্চুপ রইলেন। এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মাঝে শয়তান ও বিজাতীয় শক্তিও প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিল। গাসসান রাজ্যের রাজা জাবালা বিন আইহাম কাব বিন মালিককে একটি প্ররোচনামূলক চিঠি লিখে পাঠান, যাতে তাঁকে মদিনা ছেড়ে সিরিয়ায় চলে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং বিশেষ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কাব বিন মালিক এটি দেখে বিচলিত হননি, বরং চিঠিটি তন্দুরে ফেলে পুড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করেন যে, রাসূলের রাগের চেয়ে অন্য কোনো রাজকীয় সম্মান তাঁর কাছে বড় নয়। বয়কটের ৪০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর নবীর বার্তাবাহক এসে নির্দেশ দিলেন যে, কাব বিন মালিককে তাঁর স্ত্রী থেকে পৃথক থাকতে হবে। কোনো প্রকার ওজর না তুলেই তিনি স্ত্রীকে পিত্রালয়ে পাঠিয়ে দিয়ে আল্লাহর হুকুম মাথা পেতে নিলেন।

অবশেষে পঞ্চাশতম দিনে ফজরের সালাত শেষে যখন তিনি তাঁর ঘরের ছাদে বিষণ্ণ হৃদয়ে বসে ছিলেন, তখন সালা পাহাড়ের চূড়া থেকে একজনের কণ্ঠস্বর উচ্চস্বরে তাঁর নাম ধরে ভেসে এল, 'হে কাব বিন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ করো!' কাব বুঝতে পারলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা নেমে এসেছে। তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন।

মসজিদে নববীতে পৌঁছালে সাহাবী طلحة (তালহা) বিন উবায়দুল্লাহ (রা.) প্রথম তাঁকে অভিনন্দন জানান। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নূরানি চেহারা খুশি ও আনন্দে পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তিনি বললেন, 'হে কাব!

তোমার জন্মের পর থেকে তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনটির সুসংবাদ নাও।' আল্লাহ তাআলা তাদের তওবা কবুল করে সূরা তাওবার এই আয়াত নাযিল করেন: 'আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং সেই তিন ব্যক্তির ওপরও (যাদের বিষয়টি স্থগিত করা হয়েছিল); পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের ওপর সঙ্কীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের নিজেদের প্রাণও তাদের ওপর দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল এবং তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই

তওবা কবুল হওয়ার পর তিনি তাদের ক্ষমা দান করলেন।' (সূরা তাওবা: ১১৭-১১৮)। এই মহান ক্ষমা লাভের পর কাব বিন মালিক তাঁর সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় সাদকা হিসেবে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও মহানবী (সা.) তাঁকে অর্ধাংশ রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেন। কাব বিন মালিক অঙ্গীকার করেন যে, তিনি আজীবন কেবল সত্য কথাই বলবেন, কারণ সত্যবাদের কারণেই আল্লাহ তাঁকে এই ভয়াবহ সঙ্কট থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এই ঘটনা কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি মুমিনের জন্য এক আলোকবর্তিকা যে, পার্থিব স্বার্থ বা সামাজিক চাপের মুখেও সত্যকে ধারণ করাই হলো নাজাতের একমাত্র পথ।