Islamic Story

আবু বকর (রা.) ও হিজরত: গুহার ভেতরে দুই বন্ধুর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

Can The Second of Two change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens faith.

আবু বকর (রা.) ও হিজরত: গুহার ভেতরে দুই বন্ধুর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত

গল্পের শিক্ষা

হিজরতের ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, আল্লাহর পথে সফলতার জন্য যথাযথ প্রস্তুতির পাশাপাশি আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখা অপরিহার্য। এছাড়া কোনো আদর্শের প্রসারে বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং নিঃস্বার্থ ত্যাগের গুরুত্ব অপরিসীম, যেমনটি আবু বকর (রা.) নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করে প্রমাণ করেছেন।

Beginning

ইসলামের ইতিহাসে হিজরত কেবল একটি দেশান্তর নয়, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এক সুস্পষ্ট বিভেদরেখা এবং দ্বীনের প্রসারের এক টার্নিং পয়েন্ট। যখন মক্কার কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করল, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় রাসুলকে মদিনায় হিজরতের অনুমতি প্রদান করেন। এই ঐতিহাসিক যাত্রার নিবিড় সঙ্গী ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.), যা ছিল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম ত্যাগের নিদর্শন।

সহিহ বুখারির ৩৯০৫ নম্বর হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, দুপুরবেলা যখন আরবের প্রচণ্ড উত্তাপে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময় রাসুলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে মুখ ঢেকে আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে উপস্থিত হন। আবু বকর (রা.) তখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর আকস্মিক ও অসময়ের আগমন দেখে দ্রুত বুঝতে পারলেন যে কোনো বিশেষ ঐশী নির্দেশ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে নির্জনে কথা বলার প্রস্তাব দিলে আবু বকর (রা.) পরম বিশ্বস্ততার সাথে জানান যে সেখানে কেবল তার পরিবারের সদস্যরাই (আসমা ও আয়েশা রা.) আছে, কারোর উপস্থিতিতে কোনো শঙ্কা নেই।

আল্লাহর রাসুল (ﷺ) তখন তাকে হিজরতের অনুমতির সুসংবাদ প্রদান করেন। এই কথা শোনার সাথে সাথে আবু বকর (রা.) অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং ব্যাকুলভাবে মহানবী (ﷺ)-এর সফরসঙ্গী হওয়ার অনুমতি চান। যখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করার সম্মতি দিলেন, তখন আবু বকর (রা.) খুশিতে কাঁদতে শুরু করেন।

ত্যাগের নেশায় আচ্ছন্ন একজন মানুষের জন্য হিজরতের মতো কণ্টকাকীর্ণ পথের সঙ্গী হতে পারাও যে কতটা আনন্দের হতে পারে, তা তাঁর চোখের পানিই প্রমাণ দিচ্ছিল। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, তিনি এর আগে কাউকে খুশিতে এভাবে কাঁদতে দেখেননি। আবু বকর (রা.) এই সফরের গুরুত্ব অনুধাবন করে আগে থেকেই সব রকমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

The Test

তিনি দীর্ঘ চারটি মাস ধরে দুটি উটকে বিশেষ খাদ্য খাইয়ে হিজরতের সফরের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি যখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে উত্তম উটটি উপহার দিতে চাইলেন, তখন আল্লাহর রাসুল (ﷺ) তা মূল্যের বিনিময়ে গ্রহণ করতে সম্মত হন। সহিহ বুখারির ৪৭৬ নম্বর হাদিস ও অন্যান্য দলিলে দেখা যায়, ইসলামি দাওয়াতের প্রতিটি ক্ষেত্রে আদল ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নবীজি (ﷺ) আগ্রহী ছিলেন।
রাতের অন্ধকারে কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা মক্কা ত্যাগ করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সওর পর্বত, যাতে শত্রুরা বিভ্রান্ত হয়। সওর গুহায় পৌঁছানোর পর আবু বকর (রা.)-এর অনন্য ত্যাগ ও ভালোবাসার অপরূপ চিত্র ফুটে ওঠে।

ইবনে কাসিরের বর্ণনা অনুযায়ী (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া), তিনি নবীজির জীবনের নিরাপত্তার খাতিরে নিজের জীবনের পরোয়া না করে আগে গুহার ভেতরে প্রবেশ করেন। তিনি গুহার ভেতরটা পরিষ্কার করেন এবং কোনো বিষাক্ত সাপ বা বিচ্ছু যেন নবীজিকে দংশন করতে না পারে, সেজন্য নিজের চাদর ছিঁড়ে গর্তগুলো বন্ধ করে দেন। মহানবী (ﷺ) পরিশ্রান্ত হয়ে তাঁর কোলে মাথা রেখে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।

কুরাইশদের খুনিরা যখন গুহার একদম দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল এবং তাদের কথা স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল, তখন আবু বকর (রা.) নিজের জন্য নয়, বরং রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনের চিন্তায় বিচলিত হয়ে পড়লেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের (২৩৮১) বর্ণনা অনুসারে, তিনি চুপিচুপি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! তারা যদি তাদের পায়ের তলার দিকে তাকায় তবেই আমাদের দেখে ফেলবে।' এই মহাবিপদের মুহূর্তেও রাসুলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত শান্ত ও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আবু বকর (রা.)-কে সান্ত্বনা দিয়ে সেই ঐতিহাসিক কথাটি বলেন: 'হে আবু বকর!

সেই দুজনের ব্যাপারে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ?' সুরা আত-তাওবাহর ৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই ঘটনার সাক্ষ্য দিয়ে আবু বকর (রা.)-এর মর্যাদাকে পবিত্র কোরআনে চিরস্থায়ী করেছেন। সেখানে বর্ণিত হয়েছে: 'যদি তোমরা তাকে (নবীকে) সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাকে বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিলেন, তখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলছিলেন— বিষণ্ণ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।' এখানে কোরআনে তাকে 'সা-নি ইয়াসনাইনি' বা 'দুইজনের দ্বিতীয় জন' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা বড় সম্মানের বিষয়। গুহার ভেতর তারা তিন রাত অবস্থান করেন।

The Lesson

এই কঠিন সময়ে আবু বকর (রা.)-এর পুরো পরিবার একটি সুপরিকল্পিত মিশনের মতো সাহায্য করেছিলেন। তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ দিনভর কুরাইশদের গতিবিধি ও ষড়যন্ত্রের খবর সংগ্রহ করতেন এবং রাতের অন্ধকারে চরম ঝুঁকি নিয়ে তা গুহায় পৌঁছে দিতেন। অন্যদিকে, আবু বকর (রা.)-এর কন্যা আসমা (রা.) দুর্গম পাহাড়ের চড়াই উতরাই পার হয়ে তাদের জন্য খাবার সরবরাহ করতেন।
খাবার বহনের জন্য কোনো রশি না পেয়ে আসমা (রা.) নিজের কোমরবন্ধনী ছিঁড়ে দুই টুকরো করে খাবারের ব্যাগ ঝুলিয়েছিলেন, যার কারণে নবীজি (ﷺ) তাকে 'জাতুন নিতাকাইন' বা দুই কোমরবন্ধনীর অধিকারী উপাধি দেন। চতুর্থ দিনে তারা গুহা থেকে বের হয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত নামক একজন দক্ষ পথপ্রদর্শকের সহায়তায় উপকূলীয় পথ ধরে মদিনার দিকে রওয়ানা হন। এই দীর্ঘ যাত্রায় আবু বকর (রা.) এক অদ্ভুত মানসিক অস্থিরতায় ছিলেন রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিরাপত্তার চিন্তায়।

তিনি কখনো নবীজির সামনে হাঁটতেন, কখনো পেছনে, কখনো ডানে আবার কখনো বামে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন এর কারণ জানতে চাইলেন, তখন তিনি বলেন— হে আল্লাহর রাসুল, যখন আমার মনে হয় পিছন থেকে আক্রমণ আসবে তখন আমি আপনার পিছনে চলে যাই, আবার যখন মনে হয় সামনে থেকে আক্রমণ আসবে তখন সামনে চলে আসছি। তিনি চেয়েছিলেন শত্রুর কোনো আঘাত যেন নবীজির গায়ে না লেগে আগে তাঁর গায়ে লাগে।

হিজরতের এই পুরো সফরটি ছিল আবু বকর (রা.)-এর অন্তহীন ভালোবাসা, নিবেদন এবং আল্লাহর ওয়াদার প্রতি অবিচল আস্থার বহিঃপ্রকাশ। তিনি তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, সন্তান ও নিজের প্রাণকে বাজি রেখেছিলেন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন যে, আবু বকর (রা.) তাঁর সমস্ত অর্থ এই হিজরতের প্রস্তুতিতে ব্যয় করেছিলেন এবং তাঁর বৃদ্ধ পিতা আবু কুহাফাহ-এর জন্য ঘরে পাথর রেখে গিয়েছিলেন যাতে অন্ধ পিতা বুঝতে পারেন যে সম্পদের একটি অংশ রেখে যওয়া হয়েছে।

এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ অতিক্রম করার পর যখন তারা মদিনার উপকণ্ঠে কুবায় পৌঁছলেন, তখন ইসলামের ইতিহাসের এক নতুন সূর্য উদিত হলো। আবু বকর (রা.)-এর এই নিঃস্বার্থ ত্যাগই তাকে উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম সিদ্দিকী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে তার এই সাহচর্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা কিয়ামত অবধি মুসলিমরা তেলাওয়াত করবে।

এই হিজরত কেবল মক্কা থেকে মদিনায় স্থানান্তর ছিল না, বরং এটি ছিল ঈমানী সংহতির এক মহাসম্মিলন। আবু বকর (রা.) প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রকৃত ভালোবাসা মানে কেবল মুখে স্বীকারোক্তি নয়, বরং বিপদের মুহূর্তে নিজের যা কিছু আছে তাঁর শ্রেষ্ঠটুকু দিয়ে সঙ্গ দেওয়া। তাঁর এই আত্মত্যাগ ও ইখলাস মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনে প্রথম ও প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছিল, যা আজও মুমিনদের একনিষ্ঠ আনুগত্যের প্রেরণা জোগায়।