Islamic Story
আলী (রা.)-এর সাহসিকতা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিছানায় মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে অবস্থানের কাহিনী
Can The Sacrifice of Youth change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens.
গল্পের শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং তাঁর আদেশের আনুগত্যই হলো মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। আলী (রা.)-এর উদাহরণ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমানত রক্ষা করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্যের পথে অবিচল থাকা হচ্ছে ইসলামের মূল চেতনা, যা জীবন ত্যাগের ঝুঁকি থেকেও মহান।
Beginning
ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের ঘটনাটি এক কালজয়ী অধ্যায়, যেখানে ঈমান, বীরত্ব এবং নিখাদ আনুগত্যের এক প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জওয়ান আলী ইবন আবি তালিব (রা.)। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি রাত যাপনের গল্প নয়, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার এক চিরন্তন লড়াই। ইমাম ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' এবং 'আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ'-তে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশরা যখন দেখলো মদীনার আনসারদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাইয়াত সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে ইসলামের এক মজবুত ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, তখন তারা চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
কুরাইশ নেতারা দারুন নদওয়ায় এক জরুরি ও গোপন বৈঠকে মিলিত হলো। ইবনে কাসীরের বর্ণনা মতে, সেই বৈঠকে ইবলিস শয়তান নজদ অঞ্চলের এক বিশেষ প্রভাবশালী বৃদ্ধের বেশে উপস্থিত হয়ে তাদের কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। কতিপয় নেতা মুহাম্মদ (সা.)-কে বন্দি করার বা দেশান্তর করার প্রস্তাব দিলেও, কুরাইশদের শীর্ষ শত্রু আবু জাহেল এক ভয়াবহ পরিকল্পনা পেশ করল।
তার প্রস্তাব ছিল—প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী যুবককে নির্বাচন করা হবে এবং তারা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে তরবারির আঘাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করবে। এর উদ্দেশ্য ছিল যাতে বনু হাশিম গোত্র এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের ওপর হত্যার প্রতিশোধ বা রক্তপণ দাবি করতে না পারে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনফালের ৩০ নম্বর আয়াতে কাফেরদের এই গোপন চক্রান্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন: "স্মরণ কর, যখন কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল তোমাকে বন্দি করার জন্য, হত্যা করার জন্য অথবা নির্বাসিত করার জন্য; তারা ষড়যন্ত্র করছিল এবং আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন, আর আল্লাহই শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।" (সূরা আল-আনফাল, ৮:৩০) ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাঈল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী কারীম (সা.)-কে কুরাইশদের এই নীল-নকশা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দেন।
জিবরাঈল (আ.) তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন আজ রাতে নিজের বিছানায় বিশ্রাম না নেন এবং দ্রুত মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী ইবন আবি তালিব (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন। আলী তখন ছিলেন একজন টগবগে যুবক, অথচ তাঁর কাঁধে অর্পণ করা হলো ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ আমানত।
The Test
রাসুলুল্লাহ (সা.) আলীকে বললেন, "হে আলী, তুমি আমার এই বিছানায় ঘুমাও এবং আমার এই সবুজ হাদরামি চাদরটি গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকো। তুমি এতে নিশ্চিন্তে ঘুমাও, ইনশাআল্লাহ তাদের পক্ষ থেকে তোমার বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হবে না।" তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে, একজন মানুষের জন্য এটি ছিল আত্মাহুতির শামিল। কারণ ঘরের দরজার ঠিক বাইরেই একদল সশস্ত্র ঘাতক কেবল একটি ইশারার অপেক্ষায় ওত পেতে বসে ছিল।
আলী (রা.) জানতেন যে, ঘাতকরা যাকে মারতে এসেছে, সেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ভেবে তারা তাঁর ওপর তরবারির বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর দেওয়া নিরাপত্তার সাধারণ একটি আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আলী (রা.) কোনো তর্কা বিতর্ক ছাড়াই বিছানায় শুয়ে পড়লেন। ঈমানের এই উচ্চমার্গীয় স্তরের কারণেই সহীহ বুখারী (৩৯০৫) ও সহীহ মুসলিমে (২৪০৪) আলী (রা.)-এর এই অনন্য সম্মান ও রাসুলের সাথে তাঁর নৈকট্যের কথা বর্ণিত হয়েছে।
রাতের গভীরতা যত বাড়ছিল, ঘাতকরা ঘরের চারপাশে বেষ্টনী শক্ত করছিল। তারা দরজার ছিদ্র দিয়ে বারে বারে বিছানার দিকে তাকাচ্ছিল এবং চাদর মোড়া ছায়া দেখে নিশ্চিত হচ্ছিল যে মুহাম্মদ (সা.) ভেতরেই আছেন। কুরাইশদের নিয়ম ছিল ঘরের ভেতরে ঢুকে কাওকে আক্রমণ না করা, বরং ভোরে তিনি বের হওয়া মাত্রই তারা আক্রমণ চালাবে।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) সূরা ইয়াসিনের প্রথমিক আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে করতে অলৌকিকভাবে ঘাতকদের সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা কাফেরদের দৃষ্টির সামনে এমন এক দেয়াল তৈরি করে দিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সামনে দিয়ে চলে গেলেও তারা তাঁকে দেখতে পায়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক মুঠো ধুলো তাদের প্রত্যেকের মাথার ওপর ছিটিয়ে দিয়ে আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে যান এবং সেখান থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
এদিকে ঘাতকদের চোখের সামনে আলী (রা.) সারা রাত রাসুলের বিছানায় নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিলেন। এটি কেবল জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার বিষয় ছিল না, বরং এখানে নিহিত ছিল একটি সূক্ষ্ম রণকৌশল এবং আমানতদারিতার চরম পরাকাষ্ঠা। মক্কার কাফেররা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে ঘোর শত্রুতা পোষণ করলেও তারা জানত যে মক্কায় মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া আর কেউ এত বড় আমানতদার নেই।
The Lesson
তাই তারা তাদের গয়না, সোনা ও মুদ্রা জমা রাখার জন্য রাসুলের কাছে আসত। হিজরতের এই অনিশ্চিত মুহূর্তেও নবী (সা.) চাননি কাফেরদের একটি পয়সাও আত্মসাৎ হোক। তিনি আলী (রা.)-কে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন প্রতিটি মালিকের কাছে তাদের গচ্ছিত সম্পদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
পরদিন ভোরবেলা যখন ঘাতক দল ক্ষিপ্র গতিতে ঘরে প্রবেশ করল এবং বিছানায় চাদর সরালো, তখন তারা হতবাক হয়ে গেল। বিছানায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বদলে আলী (রা.) শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। কাফেররা চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল, "তোমার সাথী মুহাম্মদ কোথায়?" আলী (রা.) নির্ভীক চিত্তে উত্তর দিলেন, "আমি কি তাঁর পাহারাদার ছিলাম?
তোমরা তাঁকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলে, তাঁর প্রতি অন্যায় করেছিলে—তাই তিনি চলে গেছেন।" ক্রুদ্ধ কুরাইশরা আলীকে কিছুটা প্রহার ও ধমক দিলেও তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো, কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল রাসুলুল্লাহ (সা.)। এরপরের দিনগুলো ছিল আলী (রা.)-এর ধৈর্যের পরীক্ষা। তিনি পরবর্তী তিন দিন মক্কায় অবস্থান করলেন।
তিনি কাফেরদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে প্রতিটি আমানতকারীর কাছে গিয়ে বিনীতভাবে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দিলেন। শত্রুপরিবেষ্টিত মক্কায় যেখানে তাঁর প্রাণের ঝুঁকি ছিল পদে পদে, সেখানে তিনি সত্যের পতাকাবাহী হয়ে রাসুলের নির্দেশ অক্ষর অক্ষরে পালন করলেন। সকল পাওনা চুকিয়ে দিয়ে তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে একাকী পদব্রজে রওনা হলেন।
তপ্ত বালুকা আর বন্ধুর পাহাড় পেরিয়ে এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর পায়ের তালু দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং পা মারাত্মকভাবে ফুলে গিয়েছিল। যখন তিনি মদীনার উপকণ্ঠে কুবায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেখা পেলেন, নবীজি তাঁর প্রিয় জওয়ানের এই জখমপ্রাপ্ত অবস্থা দেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। তিনি নিজ হাত দিয়ে আলীর ফোলা পা জড়িয়ে ধরলেন এবং নিজের পবিত্র লালা তাঁর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন।
বর্ণনায় আসে, আল্লাহর অনুগ্রহে ও রাসুলের বরকতে সাথে সাথে তাঁর পা সুস্থ হয়ে গেল এবং আলী (রা.) বলেছিলেন যে তাঁর জীবনে আর কোনোদিন ঐ পায়ে কোনো ব্যথা হয়নি। আলী (রা.)-এর এই বীরত্বগাথা কেবল শারীরিক সাহসিকতার দৃষ্টান্ত নয়, বরং এটি হচ্ছে রাসুল (সা.)-এর প্রতি 'ইশকে রাসুল' বা গভীর ভালোবাসা ও অকুতোভয় বিশ্বাসের চরম পরীক্ষা। এই রাতটিই ছিল ইসলামের ইতিহাসে ঈমানের সেই বিজয়ের রাত, যেখানে একটি যুবক প্রবৃত্তি ও ভয়ের ওপর জয়লাভ করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের ঘটনাটি এক কালজয়ী অধ্যায়, যেখানে ঈমান, বীরত্ব এবং নিখাদ আনুগত্যের এক প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জওয়ান আলী ইবন আবি তালিব (রা.)। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি রাত যাপনের গল্প নয়, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার এক চিরন্তন লড়াই। ইমাম ইবনে কাসীর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' এবং 'আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ'-তে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশরা যখন দেখলো মদীনার আনসারদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাইয়াত সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে ইসলামের এক মজবুত ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, তখন তারা চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
কুরাইশ নেতারা দারুন নদওয়ায় এক জরুরি ও গোপন বৈঠকে মিলিত হলো। ইবনে কাসীরের বর্ণনা মতে, সেই বৈঠকে ইবলিস শয়তান নজদ অঞ্চলের এক বিশেষ প্রভাবশালী বৃদ্ধের বেশে উপস্থিত হয়ে তাদের কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। কতিপয় নেতা মুহাম্মদ (সা.)-কে বন্দি করার বা দেশান্তর করার প্রস্তাব দিলেও, কুরাইশদের শীর্ষ শত্রু আবু জাহেল এক ভয়াবহ পরিকল্পনা পেশ করল।
তার প্রস্তাব ছিল—প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী যুবককে নির্বাচন করা হবে এবং তারা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে তরবারির আঘাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করবে। এর উদ্দেশ্য ছিল যাতে বনু হাশিম গোত্র এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের ওপর হত্যার প্রতিশোধ বা রক্তপণ দাবি করতে না পারে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনফালের ৩০ নম্বর আয়াতে কাফেরদের এই গোপন চক্রান্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন: "স্মরণ কর, যখন কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল তোমাকে বন্দি করার জন্য, হত্যা করার জন্য অথবা নির্বাসিত করার জন্য; তারা ষড়যন্ত্র করছিল এবং আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন, আর আল্লাহই শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।" (সূরা আল-আনফাল, ৮:৩০) ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাঈল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী কারীম (সা.)-কে কুরাইশদের এই নীল-নকশা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দেন।
জিবরাঈল (আ.) তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন আজ রাতে নিজের বিছানায় বিশ্রাম না নেন এবং দ্রুত মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী ইবন আবি তালিব (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন। আলী তখন ছিলেন একজন টগবগে যুবক, অথচ তাঁর কাঁধে অর্পণ করা হলো ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ আমানত।
The Test
রাসুলুল্লাহ (সা.) আলীকে বললেন, "হে আলী, তুমি আমার এই বিছানায় ঘুমাও এবং আমার এই সবুজ হাদরামি চাদরটি গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকো। তুমি এতে নিশ্চিন্তে ঘুমাও, ইনশাআল্লাহ তাদের পক্ষ থেকে তোমার বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হবে না।" তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে, একজন মানুষের জন্য এটি ছিল আত্মাহুতির শামিল। কারণ ঘরের দরজার ঠিক বাইরেই একদল সশস্ত্র ঘাতক কেবল একটি ইশারার অপেক্ষায় ওত পেতে বসে ছিল।
আলী (রা.) জানতেন যে, ঘাতকরা যাকে মারতে এসেছে, সেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ভেবে তারা তাঁর ওপর তরবারির বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর দেওয়া নিরাপত্তার সাধারণ একটি আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আলী (রা.) কোনো তর্কা বিতর্ক ছাড়াই বিছানায় শুয়ে পড়লেন। ঈমানের এই উচ্চমার্গীয় স্তরের কারণেই সহীহ বুখারী (৩৯০৫) ও সহীহ মুসলিমে (২৪০৪) আলী (রা.)-এর এই অনন্য সম্মান ও রাসুলের সাথে তাঁর নৈকট্যের কথা বর্ণিত হয়েছে।
রাতের গভীরতা যত বাড়ছিল, ঘাতকরা ঘরের চারপাশে বেষ্টনী শক্ত করছিল। তারা দরজার ছিদ্র দিয়ে বারে বারে বিছানার দিকে তাকাচ্ছিল এবং চাদর মোড়া ছায়া দেখে নিশ্চিত হচ্ছিল যে মুহাম্মদ (সা.) ভেতরেই আছেন। কুরাইশদের নিয়ম ছিল ঘরের ভেতরে ঢুকে কাওকে আক্রমণ না করা, বরং ভোরে তিনি বের হওয়া মাত্রই তারা আক্রমণ চালাবে।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) সূরা ইয়াসিনের প্রথমিক আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে করতে অলৌকিকভাবে ঘাতকদের সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা কাফেরদের দৃষ্টির সামনে এমন এক দেয়াল তৈরি করে দিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের সামনে দিয়ে চলে গেলেও তারা তাঁকে দেখতে পায়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক মুঠো ধুলো তাদের প্রত্যেকের মাথার ওপর ছিটিয়ে দিয়ে আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে যান এবং সেখান থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
এদিকে ঘাতকদের চোখের সামনে আলী (রা.) সারা রাত রাসুলের বিছানায় নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিলেন। এটি কেবল জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার বিষয় ছিল না, বরং এখানে নিহিত ছিল একটি সূক্ষ্ম রণকৌশল এবং আমানতদারিতার চরম পরাকাষ্ঠা। মক্কার কাফেররা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে ঘোর শত্রুতা পোষণ করলেও তারা জানত যে মক্কায় মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া আর কেউ এত বড় আমানতদার নেই।
The Lesson
তাই তারা তাদের গয়না, সোনা ও মুদ্রা জমা রাখার জন্য রাসুলের কাছে আসত। হিজরতের এই অনিশ্চিত মুহূর্তেও নবী (সা.) চাননি কাফেরদের একটি পয়সাও আত্মসাৎ হোক। তিনি আলী (রা.)-কে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন প্রতিটি মালিকের কাছে তাদের গচ্ছিত সম্পদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
পরদিন ভোরবেলা যখন ঘাতক দল ক্ষিপ্র গতিতে ঘরে প্রবেশ করল এবং বিছানায় চাদর সরালো, তখন তারা হতবাক হয়ে গেল। বিছানায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বদলে আলী (রা.) শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। কাফেররা চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল, "তোমার সাথী মুহাম্মদ কোথায়?" আলী (রা.) নির্ভীক চিত্তে উত্তর দিলেন, "আমি কি তাঁর পাহারাদার ছিলাম?
তোমরা তাঁকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলে, তাঁর প্রতি অন্যায় করেছিলে—তাই তিনি চলে গেছেন।" ক্রুদ্ধ কুরাইশরা আলীকে কিছুটা প্রহার ও ধমক দিলেও তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো, কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল রাসুলুল্লাহ (সা.)। এরপরের দিনগুলো ছিল আলী (রা.)-এর ধৈর্যের পরীক্ষা। তিনি পরবর্তী তিন দিন মক্কায় অবস্থান করলেন।
তিনি কাফেরদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে প্রতিটি আমানতকারীর কাছে গিয়ে বিনীতভাবে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দিলেন। শত্রুপরিবেষ্টিত মক্কায় যেখানে তাঁর প্রাণের ঝুঁকি ছিল পদে পদে, সেখানে তিনি সত্যের পতাকাবাহী হয়ে রাসুলের নির্দেশ অক্ষর অক্ষরে পালন করলেন। সকল পাওনা চুকিয়ে দিয়ে তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে একাকী পদব্রজে রওনা হলেন।
তপ্ত বালুকা আর বন্ধুর পাহাড় পেরিয়ে এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর পায়ের তালু দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং পা মারাত্মকভাবে ফুলে গিয়েছিল। যখন তিনি মদীনার উপকণ্ঠে কুবায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেখা পেলেন, নবীজি তাঁর প্রিয় জওয়ানের এই জখমপ্রাপ্ত অবস্থা দেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। তিনি নিজ হাত দিয়ে আলীর ফোলা পা জড়িয়ে ধরলেন এবং নিজের পবিত্র লালা তাঁর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন।
বর্ণনায় আসে, আল্লাহর অনুগ্রহে ও রাসুলের বরকতে সাথে সাথে তাঁর পা সুস্থ হয়ে গেল এবং আলী (রা.) বলেছিলেন যে তাঁর জীবনে আর কোনোদিন ঐ পায়ে কোনো ব্যথা হয়নি। আলী (রা.)-এর এই বীরত্বগাথা কেবল শারীরিক সাহসিকতার দৃষ্টান্ত নয়, বরং এটি হচ্ছে রাসুল (সা.)-এর প্রতি 'ইশকে রাসুল' বা গভীর ভালোবাসা ও অকুতোভয় বিশ্বাসের চরম পরীক্ষা। এই রাতটিই ছিল ইসলামের ইতিহাসে ঈমানের সেই বিজয়ের রাত, যেখানে একটি যুবক প্রবৃত্তি ও ভয়ের ওপর জয়লাভ করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।