Islamic Story

হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া: বার্ধক্যে সন্তান লাভের অলৌকিক সুসংবাদ

Can Prophet Zakariyya change your heart today? Discover sincere dua, hope, and answered prayer in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens fa.

হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া: বার্ধক্যে সন্তান লাভের অলৌকিক সুসংবাদ

গল্পের শিক্ষা

আল্লাহর রহমত থেকে কখনও নিরাশ হওয়া উচিত নয়। যখন মানুষ কায়মনোবাক্যে এবং ইখলাসের সাথে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ তখন জাগতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর বান্দার প্রার্থনা কবুল করেন। সবর, নেক আমল এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরই হলো অসম্ভবকে সম্ভব করার চাবিকাঠি।

Beginning

হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর পবিত্র জীবন ও তাঁর অলৌকিক সন্তান প্রাপ্তির ঘটনা পবিত্র কুরআনের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী ও অনুপ্রেরণাদায়ক অংশ। তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈলের একজন অত্যন্ত আল্লাহভীরু নবী এবং তাদের ধর্মীয় নেতা। বার্ধক্যের শেষ সীমায় এসেও আল্লাহর রহমতের প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাস আমাদের জন্য এক অবিনাশী শিক্ষা।

ইবনে কাসীরের বর্ণনা এবং কুরআনের আয়াতের আলোকে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো। ### হযরত মারইয়াম (আ.)-এর সান্নিধ্য ও জাকারিয়া (আ.)-এর অনুপ্রেরণা ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন হযরত জাকারিয়া (আ.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পবিত্র দায়িত্ব লাভ করেন। সূরা আল-ইমরানে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি হযরত মারইয়াম (আ.)-এর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

মারইয়াম (আ.)-এর মা তাঁকে আল্লাহর ঘরের খেদমতের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। জাকারিয়া (আ.) তাঁকে হিকলের (বাইতুল মাকদাস) একটি নির্জন কক্ষে বা মিহরাবে রেখেছিলেন যেখানে তিনি নিবিষ্ট মনে ইবাদত করতেন। হযরত জাকারিয়া (আ.) ছিলেন মারইয়াম (আ.)-এর খালু এবং তাঁর অভিভাবক।

ইমাম ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, হিকলের সেই সংরক্ষিত কক্ষে জাকারিয়া (আ.) যখনই প্রবেশ করতেন, তখনই সেখানে আশ্চর্যজনক কিছু বিষয় তাঁর নজরে আসত। তিনি দেখতেন, সেখানে মৌসুমের বাইরেও প্রচুর পরিমাণে ফলমূল ও খাদ্যসামগ্রী বিদ্যমান। অর্থাৎ শীতকালে এমন সব ফল থাকত যা কেবল গ্রীষ্মকালে পাওয়া যায় এবং গ্রীষ্মকালে এমন সব ফল থাকত যা কেবল শীতকালে সম্ভব।

বিস্মিত হয়ে তিনি মারইয়াম (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে মারইয়াম, তোমার কাছে এগুলো কোথা থেকে এলো?" মারইয়াম (আ.) অত্যন্ত দৃঢ়তা ও বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন, "এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিজিক দান করেন" (সূরা আল-ইমরান, ৩:৩৭)। ### আল্লাহর কাছে জাকারিয়া (আ.)-এর আকুল প্রার্থনা মারইয়াম (আ.)-এর এই অলৌকিক রিজিক লাভের দৃশ্য দেখে হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর অন্তরে এক গভীর অনুপ্রেরণা জাগ্রত হলো।

তিনি চিন্তা করলেন, যিনি কোনো বাহ্যিক মাধ্যম বা ঋতু ছাড়াই বেমৌসুমি ফল দান করতে পারেন, তিনি তাঁর মতো একজন বৃদ্ধ মানুষকেও সন্তান দান করতে সক্ষম—এমনকি যদি তাঁর স্ত্রী বন্ধ্যাও হন। এই উপলব্ধি থেকে তিনি সরাসরি আল্লাহর রহমতের দিকে মনোনিবেশ করলেন। উল্লেখ্য যে, তখন জাকারিয়া (আ.)-এর বয়স ছিল প্রায় ৯০ বা ১০০ বছরের কাছাকাছি এবং তাঁর চুল শুভ্রতায় সাদা হয়ে গিয়েছিল।
সূরা মারইয়ামে (১৯:২-৬) তাঁর এই প্রার্থনার দৃশ্য অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে চিত্রিত হয়েছে। তিনি অত্যন্ত গোপনে, নিভৃতে তাঁর রবের কাছে মোনাজাত করলেন কারণ তিনি জানতেন যে মহান আল্লাহ মানুষের মনের খবর জানেন। তিনি বললেন, "হে আমার পালনকর্তা!

The Test

আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে এবং বার্ধক্যের শুভ্রতায় আমার মাথা ছেয়ে গেছে। হে আমার রব, ইতিপূর্বে আপনাকে ডেকে আমি কখনও ব্যর্থ হইনি।" তিনি আরও আরজ করলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা যেন সত্যের পথে থাকে এবং দীনের দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা না করে। তিনি কেবল নিজের বংশ রক্ষার জন্য নয়, বরং এমন একজন সুযোগ্য উত্তরাধিকারী চাইলেন যিনি নবী ইউসুফের বংশের মীরাস এবং দীনের দায়িত্ব সুচারুভাবে বহন করবেন।

তিনি প্রার্থনা করলেন, "অতএব আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন" (সূরা মারইয়াম, ১৯:৫)। ### কবুলিয়ত ও ইয়াহইয়া (আ.)-এর সুসংবাদ জাকারিয়া (আ.)-এর এই আন্তরিক ও নির্লিপ্ত প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে তাৎক্ষণিক কবুল হলো। সূরা আল-ইমরানের ৩৯ নম্বর আয়াতে এর চমৎকার বর্ণনা রয়েছে।

জাকারিয়া (আ.) যখন মিহরাবে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিলেন, তখন ফেরেশতারা সমস্বরে তাঁকে সুসংবাদ দিলেন। ফেরেশতারা বললেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে ইয়াহইয়া নামকপুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছেন, যে আল্লাহর একটি বাণীর (ঈসা আ.) সত্যায়নকারী হবে, সে হবে নেতা, জিতেন্দ্রিয় এবং সৎকর্মপরায়ণ নবীদের অন্তর্ভুক্ত।" এই অকল্পনীয় সুসংবাদ শুনে মানুষ হিসেবে জাকারিয়া (আ.) কিছুটা বিস্মিত হলেন। সৃষ্টির জাগতিক নিয়মে মানুষের বার্ধক্য এবং স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব সন্তান লাভের বড় অন্তরায়।

তিনি বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করলেন, "হে আমার প্রভু!

আমার কীভাবে পুত্র সন্তান হবে যখন আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি এবং আমার স্ত্রীও বন্ধ্যা?" প্রতিউত্তরে আল্লাহ তাআলা জানালেন, "এভাবেই আল্লাহ যা চান তাই করেন।" জাকারিয়া (আ.)-কে মনে করিয়ে দেওয়া হলো যে, আল্লাহ ইতিপূর্বে তাঁকে সৃষ্টি করেছেন যখন তিনি কিছুই ছিলেন না। সূরা আল-আম্বিয়াতে (আয়াত ৯০) এই দম্পতির প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, "অতঃপর আমি তাঁর দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া এবং তাঁর স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলেন। তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত এবং তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভয় নিয়ে, আর তারা ছিল আমার প্রতি বিনয়ী।" ### নিদর্শন প্রার্থনা ও তিন দিনের নীরবতা অন্তরের প্রশান্তি এবং এই অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার জন্য জাকারিয়া (আ.) আল্লাহর কাছে একটি নিদর্শন বা চিহ্ন চাইলেন।

তিনি বললেন, "হে আমার রব, আমাকে একটি নির্দশন দিন।" আল্লাহ উত্তর দিলেন, "আপনার নিদর্শন এই যে, আপনি টানা তিন দিন ইশারা ছাড়া মানুষের সাথে কোনো কথা বলতে পারবেন না" (সূরা আল-ইমরান, ৩:৪১)। এটি ছিল আল্লাহর এক মহান কুদরত। তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা সত্ত্বেও মানুষের সাথে কথা বলতে পারছিলেন না, কিন্তু তাঁর জিব বা মুখ আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
ফলে তিনি যখন তাঁর লোকদের কাছে ফিরে এলেন, তিনি তাদের ইশারায় নির্দেশ দিলেন যে, তারা যেন সকাল-সন্ধ্যায় মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। এই সময়টি তিনি একাত্মভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে মগ্ন থাকলেন। ### নবী ইয়াহইয়া (আ.)-এর বৈশিষ্ট্য যথাসময়ে জাকারিয়া (আ.) ও তাঁর স্ত্রীর ঘরে জন্মগ্রহণ করলেন হযরত ইয়াহইয়া (আ.)।

The Lesson

তাঁর নামটিও ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত। ইতিপূর্বে এই নামে আল্লাহ কাউকে সৃষ্টি করেননি। ইয়াহইয়া (আ.)-এর শৈশব ও চরিত্র সম্পর্কে সূরা মারইয়ামে (১৯:১২-১৫) আল্লাহ বলেন, তাকে শৈশবেই 'হিকমত' বা বিশেষ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করা হয়েছিল।

তিনি ছিলেন মানুষের প্রতি দয়ালু, অত্যন্ত পবিত্র এবং তিনি ছিলেন তাঁর পিতা-মাতার একান্ত অনুগত এবং আল্লাহভীরু। তিনি কখনও উদ্ধত বা অবাধ্য ছিলেন না। তাফসীরে ইবনে কাসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইয়াহইয়া (আ.) ছোটবেলা থেকেই সাধারণ খেলার দিকে আকর্ষণ বোধ করতেন না।

যদি কেউ তাঁকে খেলার জন্য ডাকত, তিনি বলতেন, "আমি কি খেলার জন্য সৃষ্টি হয়েছি?" তিনি সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতে পছন্দ করতেন। আল্লাহ তাঁকে ঈসা (আ.)-এর আগমনের পথ প্রশস্ত করার এবং তাওরাতের বিধানসমূহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ### উপসংহার ও শিক্ষা হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর এই ঘটনা থেকে মুমিনদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে: ১.

**দোয়ার শক্তি:** যৌক্তিক দিক থেকে যা অসম্ভব মনে হয়, একাগ্রতা ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দোয়া করলে আল্লাহ তা সম্ভব করে দেন। জাকারিয়া (আ.)-এর বার্ধক্য ও স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব আল্লাহর কুদরতের সামনে কোনো বাধা ছিল না। ২.

**গোপন প্রার্থনা:** জাকারিয়া (আ.) গোপনে নিচু স্বরে প্রার্থনা করেছিলেন। এটি শিখায় যে, ইবাদত ও প্রার্থনায় বিনয় এবং একাগ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৩. **আল্লাহর কুদরতে বিশ্বাস:** মারইয়াম (আ.)-এর কাছে বেমৌসুমি ফল দেখে জাকারিয়া (আ.) যে শিক্ষা নিয়েছিলেন, তা হলো আল্লাহর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। ৪.

**পারিবারিক ঐতিহ্য:** জাকারিয়া (আ.) সন্তান চেয়েছিলেন কেবল বংশ রক্ষার জন্য নয়, বরং আল্লাহর দীনের খেদমত অব্যাহত রাখার জন্য। পরিশেষে, জাকারিয়া (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.)-এর এই কাহিনী আমাদের শিখায় যে, আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখলে এবং তাঁর পথে অবিচল থাকলে তিনি বান্দার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়কেই সফলকাম করেন। এটি ধৈর্যের এক মূর্ত প্রতীক যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বাসীদের পথ দেখাবে।