Islamic Story
হযরত ইউনুস (আ.)-এর তওবা: মাছের পেটে আল্লাহর তাসবীহ পাঠের অলৌকিক ঘটনা
Can Prophet Yunus change your heart today? Discover dua in darkness, hope, and divine rescue in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens fait.
গল্পের শিক্ষা
ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা একজন মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভুলবশত আল্লাহ যা পছন্দ করেন না এমন কিছু করে ফেললে বিনয়ের সঙ্গে তওবা করা এবং আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা বিপদমুক্তির গ্যারান্টি স্বরূপ। 'লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন' দোয়াটি প্রতিটি মুমিনের জন্য অন্ধকার ও কঠিন পরিস্থিতিতে আলোর দিশারী।
Beginning
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবিগণের কাহিনির মধ্যে ইউনুস (আঃ)-এর ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিকতায় পূর্ণ। মহান আল্লাহ ইউনুস (আঃ)-কে তৎকালীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) নিনাওয়াহ নামক অঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। নিনাওয়াহ ছিল সেই সময়ের এক বিশাল ও সমৃদ্ধশালী জনপদ, যেখানে প্রায় এক লক্ষাধিক মানুষের বসবাস ছিল।
সেখানে তিনি দীর্ঘকাল ধরে মানুষকে তাওহীদের সুমহান বাণীর দিকে আহ্বান জানান এবং শিরক ও মূর্তিপূজার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন। কিন্তু তার নিরলস দাওয়াত ও প্রচেষ্টার পরও সেই জনপদের লোকেরা সত্যকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং নিজেদের কুফুরি ও পাপাচারের ওপর অনড় থাকে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) তার তাফসির ও ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, নবি ইউনুস (আঃ) তাদের অবাধ্যতায় অত্যন্ত ব্যথিত ও রাগান্বিত হন।
তাদের পক্ষ থেকে কোনো হেদায়েতের সম্ভাবনা না দেখে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেশত্যাগের চূড়ান্ত নির্দেশ পাওয়ার পূর্বেই অভিমান করে জনপদ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘এবং স্মরণ করুন জুন-নুন (মাছওয়ালা)-এর কথা, যখন তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিলেন’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭)। তিনি যখন বসতি থেকে বের হয়ে যান, তখন তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তার অবাধ্য জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
ইউনুস (আঃ) চলে যাওয়ার পরপরই নিনাওয়াহর আকাশে আজাবের কালো মেঘ ও ভয়ংকর চিহ্ন পরিস্ফুট হতে শুরু করে। জনপদের মানুষ বুঝতে পারে যে নবি যা সত্য বলেছিলেন, তা পূর্ণ হতে চলেছে এবং আল্লাহর আজাব তাদের গ্রাস করতে আসছে। তখন তারা ভয়াতুর হৃদয়ে জঙ্গল ও পাহাড়ে বেরিয়ে আসে।
তারা তাদের চতুষ্পদ জন্তু ও শিশুদের নিয়ে আল্লাহর কাছে উচ্চস্বরে রোনাজারি ও তওবা করতে শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা তাদের হৃদয়ের আন্তরিকতা ও সত্য তওবা দেখে দয়াপরবশ হলেন এবং সেই মহা বিপদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করলেন। সূরা ইউনুসে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ইউনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত এমন কোনো জনপদ কেন হলো না যারা ঈমান আনত এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসত?
The Test
ইউনুসের সম্প্রদায় যখন ঈমান আনল তখন আমি তাদের দুনিয়ার অপমানজনক আজাব দূর করলাম এবং তাদের নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিলাম’ (সূরা ইউনুস: ৯৮)। এটি ছিল নবিদের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত যে, পুরো জাতি একযোগে তওবা করে আল্লাহর গজব থেকে মুক্তি পেয়েছে। এদিকে রাসুল ইউনুস (আঃ) সমুদ্রের তীরের দিকে পৌঁছে একটি আরোহী পূর্ণ জাহাজে উঠলেন।
গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পর জাহাজটি হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে এবং উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে টালমাটাল হয়ে যায়। নাবিক ও আরোহীরা মনে করল, জাহাজে অতিরিক্ত ওজন হয়েছে অথবা এটি কোনো পাপিষ্ঠ মানুষের উপস্থিতি নির্দেশ করছে। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী তারা সিদ্ধান্ত নিল যে লটারি করা হবে এবং যার নাম উঠবে তাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে জাহাজ হালকা করা হবে।
লটারি করা হলে আশ্চর্যজনকভাবে ইউনুস (আঃ)-এর নাম উঠল। তারা তাকে সম্মান করত বলে তিনবার লটারি করল, কিন্তু প্রতিবারই তার নাম উঠে এল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘অতঃপর তিনি লটারিতে শরিক হলেন এবং হারলেন’ (সূরা আস-সাফফাত: ১৪১)।
অবশেষে আল্লাহর ফয়সালা মেনে নিয়ে তিনি উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন। আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত নির্দেশে তখন এক প্রকাণ্ড বিশাল মাছ তাকে গিলে ফেলল। তবে আল্লাহ সেই মাছটিকে অলৌকিক নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ‘হে মাছ, ইউনুস তোমার রিজিক নয়।
তুমি তার একটি হাড়ও ভাঙবে না এবং তার চামড়ার কোনো ক্ষতি করবে না। তার জন্য তোমার পেট হবে একটি কারাগার বা নিরাপদ স্থান’। ইউনুস (আঃ) মাছের পেটের ভেতর বন্দি হয়ে অন্ধকারের সাগরে লীন হয়ে গেলেন।
সেখানে তিনি একে একে তিন স্তরের অন্ধকারময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন— প্রথমত মাছের পেটের ঘোর অন্ধকার, দ্বিতীয়ত গভীর সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার এবং তৃতীয়ত রাতের নিকষ অন্ধকার। এই চরম অসহায় ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় তিনি নিজের সেই ইজতিহাদগত ভুলের গুরুত্ব বুঝতে পারলেন এবং মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকলেন। তিনি মাছের পেটে বসেই পরম করুণাময় আল্লাহর প্রার্থনা শুরু করলেন যা ‘দুয়া ইউনুস’ নামে পরিচিত।
তিনি আরজ করলেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন’ অর্থাৎ ‘আপনি ব্যতীত আর কোনো সত্য উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি বা অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭)। ইবনে কাসীর উলেখ করেছেন যে, যখন তিনি এই তাসবীহ পাঠ করছিলেন, তখন গভীর সমুদ্রের পাথর, বালু ও জলজ প্রাণীরাও তার সাথে তাল মিলিয়ে আল্লাহর তসবিহ পাঠ করতে শুরু করে।
ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বললেন, ‘হে মাবুদ, এটি তো একটি অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর, যা কোনো এক অপরিচিত স্থান থেকে আসছে’। আল্লাহ তায়ালা উত্তর দিলেন, ‘এটি আমার বান্দা ইউনুস’। আল্লাহ তায়ালা তার এই মুখলাছপূর্ণ আজারি ও প্রার্থনা কবুল করলেন।
The Lesson
পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। এভাবেই আমি বিশ্বাসীদের মুক্তি দিয়ে থাকি’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৮)। আল্লাহর আদেশে মাছটি সমুদ্রের তটে গিয়ে তাকে জীবিত অবস্থায় উগরে দিল।
দীর্ঘ সময় মাছের পেটে থাকার ফলে এবং হজমকারী এনজাইমের প্রভাবে তার শরীরের চামড়া অত্যন্ত পাতলা ও রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি এতই দুর্বল ছিলেন যে নড়াচড়া করার শক্তিও হারিয়েছিলেন। এ অবস্থায় আল্লাহ তার মাথার ওপর একটি দ্রুত বর্ধনশীল ছায়াযুক্ত ইয়াকতীন (লাউ জাতীয় বিশাল পাতাযুক্ত) গাছ উৎপন্ন করলেন।
সেই গাছের ছায়া তাকে তপ্ত রোদ থেকে রক্ষা করত এবং এর পত্র-পলস্নবের ঘ্রাণ ও রস তাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ঔষধের কাজ দিত। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আল্লাহ তাকে পুনরায় তার সেই পূর্বের জাতির নিকট ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর বিশেষ হেকমতে তিনি ফিরে গিয়ে দেখলেন যে তার পুরো এক লক্ষাধিক জাতিই মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ওপর ঈমান এনে অধীর আগ্রহে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
সূরা সাফফাতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে এক লাখ বা ততোধিক মানুষের কাছে পাঠালাম। তারা ঈমান আনল, ফলে আমি তাদেরকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিলাম’ (সূরা আস-সাফফাত: ১৪৭-১৪৮)। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এই বরকতময় কাহিনির শিক্ষা অত্যন্ত জোরালোভাবে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যে কোনো মুসলিম বিপদগ্রস্ত অবস্থায় ইউনুস (আঃ)-এর এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে যা চাইবে, আল্লাহ অবশ্যই তার প্রার্থনা মঞ্জুর করবেন’। ইউনুস (আঃ)-এর এই মহিমান্বিত ঘটনাটি মুমিনদের জন্য এক যুগান্তকারী শিক্ষা বহন করে। এটি শেখায় যে, জীবনের সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুম পালনে সচেষ্ট থাকা উচিত এবং বিপদে পড়লে ক্ষোভ না দেখিয়ে বিনীতভাবে তওবা করা কর্তব্য।
মাছের পেটের জমাট অন্ধকার থেকেও যেভাবে মুক্তি সম্ভব হয়েছে, তেমনি দুনিয়ার যেকোনো জটিল পরিস্থিতি থেকে আল্লাহ তার মুখলিস বান্দাদের মুক্তি দিতে সক্ষম। ইউনুস (আঃ)-এর এই মোজেজা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি সংকটাপন্ন বিশ্বাসীর জন্য এক অনিঃশেষ আশার আলো।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবিগণের কাহিনির মধ্যে ইউনুস (আঃ)-এর ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিকতায় পূর্ণ। মহান আল্লাহ ইউনুস (আঃ)-কে তৎকালীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) নিনাওয়াহ নামক অঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। নিনাওয়াহ ছিল সেই সময়ের এক বিশাল ও সমৃদ্ধশালী জনপদ, যেখানে প্রায় এক লক্ষাধিক মানুষের বসবাস ছিল।
সেখানে তিনি দীর্ঘকাল ধরে মানুষকে তাওহীদের সুমহান বাণীর দিকে আহ্বান জানান এবং শিরক ও মূর্তিপূজার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন। কিন্তু তার নিরলস দাওয়াত ও প্রচেষ্টার পরও সেই জনপদের লোকেরা সত্যকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং নিজেদের কুফুরি ও পাপাচারের ওপর অনড় থাকে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) তার তাফসির ও ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, নবি ইউনুস (আঃ) তাদের অবাধ্যতায় অত্যন্ত ব্যথিত ও রাগান্বিত হন।
তাদের পক্ষ থেকে কোনো হেদায়েতের সম্ভাবনা না দেখে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেশত্যাগের চূড়ান্ত নির্দেশ পাওয়ার পূর্বেই অভিমান করে জনপদ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘এবং স্মরণ করুন জুন-নুন (মাছওয়ালা)-এর কথা, যখন তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিলেন’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭)। তিনি যখন বসতি থেকে বের হয়ে যান, তখন তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তার অবাধ্য জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
ইউনুস (আঃ) চলে যাওয়ার পরপরই নিনাওয়াহর আকাশে আজাবের কালো মেঘ ও ভয়ংকর চিহ্ন পরিস্ফুট হতে শুরু করে। জনপদের মানুষ বুঝতে পারে যে নবি যা সত্য বলেছিলেন, তা পূর্ণ হতে চলেছে এবং আল্লাহর আজাব তাদের গ্রাস করতে আসছে। তখন তারা ভয়াতুর হৃদয়ে জঙ্গল ও পাহাড়ে বেরিয়ে আসে।
তারা তাদের চতুষ্পদ জন্তু ও শিশুদের নিয়ে আল্লাহর কাছে উচ্চস্বরে রোনাজারি ও তওবা করতে শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা তাদের হৃদয়ের আন্তরিকতা ও সত্য তওবা দেখে দয়াপরবশ হলেন এবং সেই মহা বিপদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করলেন। সূরা ইউনুসে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ইউনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত এমন কোনো জনপদ কেন হলো না যারা ঈমান আনত এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে আসত?
The Test
ইউনুসের সম্প্রদায় যখন ঈমান আনল তখন আমি তাদের দুনিয়ার অপমানজনক আজাব দূর করলাম এবং তাদের নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিলাম’ (সূরা ইউনুস: ৯৮)। এটি ছিল নবিদের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত যে, পুরো জাতি একযোগে তওবা করে আল্লাহর গজব থেকে মুক্তি পেয়েছে। এদিকে রাসুল ইউনুস (আঃ) সমুদ্রের তীরের দিকে পৌঁছে একটি আরোহী পূর্ণ জাহাজে উঠলেন।
গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পর জাহাজটি হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে এবং উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে টালমাটাল হয়ে যায়। নাবিক ও আরোহীরা মনে করল, জাহাজে অতিরিক্ত ওজন হয়েছে অথবা এটি কোনো পাপিষ্ঠ মানুষের উপস্থিতি নির্দেশ করছে। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী তারা সিদ্ধান্ত নিল যে লটারি করা হবে এবং যার নাম উঠবে তাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে জাহাজ হালকা করা হবে।
লটারি করা হলে আশ্চর্যজনকভাবে ইউনুস (আঃ)-এর নাম উঠল। তারা তাকে সম্মান করত বলে তিনবার লটারি করল, কিন্তু প্রতিবারই তার নাম উঠে এল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘অতঃপর তিনি লটারিতে শরিক হলেন এবং হারলেন’ (সূরা আস-সাফফাত: ১৪১)।
অবশেষে আল্লাহর ফয়সালা মেনে নিয়ে তিনি উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন। আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত নির্দেশে তখন এক প্রকাণ্ড বিশাল মাছ তাকে গিলে ফেলল। তবে আল্লাহ সেই মাছটিকে অলৌকিক নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ‘হে মাছ, ইউনুস তোমার রিজিক নয়।
তুমি তার একটি হাড়ও ভাঙবে না এবং তার চামড়ার কোনো ক্ষতি করবে না। তার জন্য তোমার পেট হবে একটি কারাগার বা নিরাপদ স্থান’। ইউনুস (আঃ) মাছের পেটের ভেতর বন্দি হয়ে অন্ধকারের সাগরে লীন হয়ে গেলেন।
সেখানে তিনি একে একে তিন স্তরের অন্ধকারময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন— প্রথমত মাছের পেটের ঘোর অন্ধকার, দ্বিতীয়ত গভীর সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার এবং তৃতীয়ত রাতের নিকষ অন্ধকার। এই চরম অসহায় ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় তিনি নিজের সেই ইজতিহাদগত ভুলের গুরুত্ব বুঝতে পারলেন এবং মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকলেন। তিনি মাছের পেটে বসেই পরম করুণাময় আল্লাহর প্রার্থনা শুরু করলেন যা ‘দুয়া ইউনুস’ নামে পরিচিত।
তিনি আরজ করলেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন’ অর্থাৎ ‘আপনি ব্যতীত আর কোনো সত্য উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি বা অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭)। ইবনে কাসীর উলেখ করেছেন যে, যখন তিনি এই তাসবীহ পাঠ করছিলেন, তখন গভীর সমুদ্রের পাথর, বালু ও জলজ প্রাণীরাও তার সাথে তাল মিলিয়ে আল্লাহর তসবিহ পাঠ করতে শুরু করে।
ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বললেন, ‘হে মাবুদ, এটি তো একটি অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর, যা কোনো এক অপরিচিত স্থান থেকে আসছে’। আল্লাহ তায়ালা উত্তর দিলেন, ‘এটি আমার বান্দা ইউনুস’। আল্লাহ তায়ালা তার এই মুখলাছপূর্ণ আজারি ও প্রার্থনা কবুল করলেন।
The Lesson
পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। এভাবেই আমি বিশ্বাসীদের মুক্তি দিয়ে থাকি’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৮)। আল্লাহর আদেশে মাছটি সমুদ্রের তটে গিয়ে তাকে জীবিত অবস্থায় উগরে দিল।
দীর্ঘ সময় মাছের পেটে থাকার ফলে এবং হজমকারী এনজাইমের প্রভাবে তার শরীরের চামড়া অত্যন্ত পাতলা ও রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি এতই দুর্বল ছিলেন যে নড়াচড়া করার শক্তিও হারিয়েছিলেন। এ অবস্থায় আল্লাহ তার মাথার ওপর একটি দ্রুত বর্ধনশীল ছায়াযুক্ত ইয়াকতীন (লাউ জাতীয় বিশাল পাতাযুক্ত) গাছ উৎপন্ন করলেন।
সেই গাছের ছায়া তাকে তপ্ত রোদ থেকে রক্ষা করত এবং এর পত্র-পলস্নবের ঘ্রাণ ও রস তাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ঔষধের কাজ দিত। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আল্লাহ তাকে পুনরায় তার সেই পূর্বের জাতির নিকট ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর বিশেষ হেকমতে তিনি ফিরে গিয়ে দেখলেন যে তার পুরো এক লক্ষাধিক জাতিই মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ওপর ঈমান এনে অধীর আগ্রহে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
সূরা সাফফাতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে এক লাখ বা ততোধিক মানুষের কাছে পাঠালাম। তারা ঈমান আনল, ফলে আমি তাদেরকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিলাম’ (সূরা আস-সাফফাত: ১৪৭-১৪৮)। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এই বরকতময় কাহিনির শিক্ষা অত্যন্ত জোরালোভাবে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যে কোনো মুসলিম বিপদগ্রস্ত অবস্থায় ইউনুস (আঃ)-এর এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে যা চাইবে, আল্লাহ অবশ্যই তার প্রার্থনা মঞ্জুর করবেন’। ইউনুস (আঃ)-এর এই মহিমান্বিত ঘটনাটি মুমিনদের জন্য এক যুগান্তকারী শিক্ষা বহন করে। এটি শেখায় যে, জীবনের সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুম পালনে সচেষ্ট থাকা উচিত এবং বিপদে পড়লে ক্ষোভ না দেখিয়ে বিনীতভাবে তওবা করা কর্তব্য।
মাছের পেটের জমাট অন্ধকার থেকেও যেভাবে মুক্তি সম্ভব হয়েছে, তেমনি দুনিয়ার যেকোনো জটিল পরিস্থিতি থেকে আল্লাহ তার মুখলিস বান্দাদের মুক্তি দিতে সক্ষম। ইউনুস (আঃ)-এর এই মোজেজা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি সংকটাপন্ন বিশ্বাসীর জন্য এক অনিঃশেষ আশার আলো।