Islamic Story

হযরত সালেহ (আ.) ও সামুদ জাতি: অলৌকিক উষ্ট্রী এবং একটি অবাধ্য জাতির পরিণাম

Can Prophet Salih change your heart today? Discover obedience to signs and consequences of defiance in a Quran-based story that stirs reflection and strengthe.

হযরত সালেহ (আ.) ও সামুদ জাতি: অলৌকিক উষ্ট্রী এবং একটি অবাধ্য জাতির পরিণাম

গল্পের শিক্ষা

শিক্ষণীয় বিষয়: ১. আল্লাহর নিদর্শনের অবমাননা করলে ধ্বংস অনিবার্য। ২. পার্থিব শক্তি বা কারিগরি দক্ষতা আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা করতে পারে না। ৩. সত্যকে অস্বীকারকারী পাপিষ্ঠদের ষড়যন্ত্র থেকে আল্লাহ সবসময় মুমিনদের রক্ষা করেন।

Beginning

আদ জাতির ধ্বংসের পর জাজিরাতুল আরবের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত হিজর নামক এলাকায় সামুদ জাতির উত্থান ঘটে। তারা ছিল শারীরিক গঠন, স্থাপত্যকলা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত উন্নত ও প্রভাবশালী। বিশেষ করে বিশাল পর্বত খোদাই করে সুরম্য অট্টালিকা ও অত্যন্ত মযবুত প্রাসাদ নির্মাণে তারা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিস্ময়কর নজির স্থাপন করেছিল।

সূরা আল-আরাফ এবং সূরা হিজরে আল্লাহ তাআলা তাদের এই শিল্পনৈপুণ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রাচুর্য ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের অহংকারে তারা সীমা লঙ্ঘন করতে শুরু করে। তারা আল্লাহকে ভুলে পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয় এবং মূর্তিপূজাকে নিজেদের সংস্কৃতি বানিয়ে নেয়।

তাদের ধারণা ছিল, পাহাড়ের গায়ের এই শক্ত পাথরের ঘরগুলো তাদের চিরকাল সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য তাদেরই স্বজাতি ও এক সম্ভ্রান্ত বংশীয় ব্যক্তি সালিহ (আ.)-কে নবী হিসেবে মনোনীত করলেন। সালিহ (আ.) অতি অল্প বয়স থেকেই তাঁর প্রজ্ঞা এবং চরিত্রের জন্য কাওমের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত ছিলেন।

নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার পর তিনি তাদের নিকট তাওহীদের অমিয় বাণী প্রচার করতে শুরু করলেন। তিনি বিনম্রভাবে তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বললেন, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো সত্য মাবুদ নেই।' (কুরআন ৭:৭৩, ১১:৬১)।

তিনি তাদের আরও স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, আল্লাহই তাদের এই উর্বর মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানে বসবাস ও সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ দিয়েছেন। তিনি তাদের আদ জাতির ধ্বংসাবশেষ থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য নসিহত করলেন। কিন্তু সামুদ জাতির দম্ভী নেতারা তাঁর এই দাওয়াতকেচ্ছিল্লা করে প্রত্যাখ্যান করল।

তারা বলতে লাগল যে, সালিহকে তারা অত্যন্ত আশাবাদী ও বুদ্ধিমান মনে করত, কিন্তু সে এখন তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছে (সূরা হুদ : ৬২)। তারা তাঁর নবুয়তের সত্যতা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ পোষণ করতে লাগল। সামুদ জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এক সম্মেলনে সালিহ (আ.)-কে তুচ্ছজ্ঞান করে একটি অসম্ভব অলৌকিক নিদর্শনের দাবি উত্থাপন করল।

The Test

তারা যুক্তি দিল যে, যদি তিনি আল্লাহর প্রেরিত সত্য নবী হয়ে থাকেন, তবে যেন অলৌকিক কিছু করে দেখান। তারা একটি বিশালাকায় নিরেট মসৃণ পাথরের পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, 'যদি তুমি এই পাথর থেকে একটি বিশালাকায় এবং গর্ভবতী উষ্ট্রী বের করে আনতে পারো, তবেই আমরা তোমার ওপর ঈমান আনব।' সালিহ (আ.) তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, যদি আল্লাহ তাদের দাবি পূরণ করেন তবে তারা অবশ্যই ঈমান আনবে কি না। তারা তাতে সম্মত হলো।
অতঃপর সালিহ (আ.) মহান আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহর অসীম কুদরতে সেই নিরেট পাথরটি ফেটে স্পন্দিত হতে লাগল এবং সেখান থেকে ঠিক তাদের বর্ণনামতো একটি জীবন্ত ও বিশাল দেহাকৃতির উষ্ট্রী বের হয়ে এল। এই মহান মুজিজা বা অলৌকিক নিদর্শন দেখে তাদের নেতা জুনদুব ইবনে আমরসহ কিছু মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে ঈমান আনলেও অধিকাংশ কাফের তাদের হঠকারিতা ও জেদ বজায় রাখল।

সালিহ (আ.) তাদের সর্তক করে দিয়ে বললেন যে, এই উষ্ট্রী আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো একটি পরীক্ষা। তিনি ঘোষণা করলেন, 'এই উষ্ট্রীর জন্য একদিন পানি পানের নির্ধারিত পালা থাকবে এবং তোমাদের গবাদিপশুর জন্য একদিন নির্ধারিত থাকবে' (কুরআন ২৬:১৫৫)। কুরআনে সূরা আশ-শুয়ারা এবং সূরা আশ-শামসে এর বিশদ বর্ণনা রয়েছে।

যেদিন উষ্ট্রীটি পানি পান করত, সেদিন সে অন্য কোনো পশুকে ঘাটে আসতে দিত না, বরং একাই কূয়ার সব পানি পান করে ফেলত। বিনিময়ে সামুদ জাতির লোকেরা সেই উষ্ট্রীর ওলান থেকে এত অধিক পরিমাণ দুধ সংগ্রহ করত যা তাদের পুরো গোত্রের জন্য যথেষ্ট হতো। সালিহ (আ.) বিশেষভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, কেউ যেন এই উষ্ট্রীকে সামান্যতম আঘাত না করে।

তিনি বলেছিলেন, 'একে কোনো কষ্ট দিও না, নতুবা দ্রুত তোমাদের ওপর এক যন্ত্রণাদায়ক আজাব আপতিত হবে' (কুরআন ৭:৭৩)। বেশ কিছুকাল এই অলৌকিক উষ্ট্রীটি তাদের মাঝে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে বিচরণ করতে থাকল। কিন্তু সামুদ জাতির অবাধ্যতা ও মূর্তিপূজার মোহ তাদের হিংস্র করে তুলল।

তারা আল্লাহর নিদর্শনকে সহ্য করতে পারছিল না কারণ এটি সালিহ (আ.)-এর সত্যতার প্রমাণ দিচ্ছিল। তাই কুদাইর বিন সালিফ নামক এক পাপিষ্ঠ ও নিষ্ঠুর ব্যক্তির নেতৃত্বে ৯ জন দুষ্কৃতকারী উষ্ট্রীটিকে হত্যার গোপন চরম ষড়যন্ত্র লিপ্ত হলো। পবিত্র কুরআনে এদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং কোনো ভালো কাজ করত না (সূরা নামল : ৪৮)।

যদিও সালিহ (আ.) তাদের বারবার আল্লাহর গজবের ভয় দেখিয়ে আসছিলেন, কিন্তু তাদের দম্ভ তাদের অন্ধ করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত তারা ওত পেতে থেকে সেই উষ্ট্রীটিকে আক্রমণ করল। কুদাইর বিন সালিফ তলোয়ার দিয়ে উষ্ট্রীর পায়ের রগ কেটে দিল এবং নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করল।

The Lesson

উষ্ট্রীটি হত্যার পর তারা আল্লাহর রাসুলের সাথে বিদ্রূপ শুরু করল। তারা দাম্ভিকতার সাথে সালিহ (আ.)-কে ডেকে বলল, 'সালেহ! তুমি যদি সত্যবাদী রাসুল হও তবে যার ভয় তুমি আমাদের দেখাচ্ছ তা নিয়ে আসো' (সূরা আরাফ : ৭৭)। তাদের এই চূড়ান্ত চরম অবাধ্যতা ও নৃশংসতায় সালিহ (আ.) অত্যন্ত মর্মাহত হলেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ধ্বংসবার্ত ঘোষণা করলেন। তিনি তাদের নির্ধারিত সময় দিয়ে বললেন, 'তোমরা তোমাদের ঘরে মাত্র তিন দিন সময় উপভোগ করে নাও, এটি এমন এক প্রতিশ্রুতি যা কখনো মিথ্যা হবে না' (কুরআন ১১:৬৫)।

তফসির ইবনে কাসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, এই তিন দিনে তাদের মধ্যে আল্লাহর কুদরতের চূড়ান্ত লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকল। শাস্তির প্রথম দিন সামুদ জাতির সবার মুখমণ্ডল হলুদ বর্ণ ধারণ করল, দ্বিতীয় দিন তাদের চেহারা হয়ে গেল রক্তিম লাল এবং তৃতীয় দিন তা গাঢ় কালো বর্ণ ধারণ করল। তারা নিশ্চিত হয়ে গেল যে ধ্বংস অনিবার্য।

এই তিন দিনের অন্তিম সময়ে সেই নয় জন পাপিষ্ঠের দল এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করল। তারা চাইল আজাব আসার আগেই সালিহ (আ.) এবং তাঁর পরিবারকে রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা হামলা করে হত্যা করে ফেলবে (সূরা নামল : ৫০)। তারা শপথ করল যে তারা এই কাজ সম্পন্ন করবে।

কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের এই ষড়যন্ত্রের সমুচিত জওয়াব দিলেন। তারা যখন সালিহ (আ.)-এর বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাদের ওপর আকাশ থেকে প্রচণ্ড প্রস্তর বর্ষণ করে তাদের আগে ধ্বংস করে দিলেন। অবশেষে সেই নির্ধারিত তৃতীয় দিনের প্রভাতে সূর্যোদয়ের সময় এক প্রলয়ংকরী মহাগর্জন (আস-সায়েহাহ) এবং সাথে প্রচণ্ড ভূমিকম্প ও আকাশ থেকে বজ্রবিদ্যুৎ তাদের ওপর আপতিত হলো।

ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন যে, এই আওয়াজ এতই ভয়াবহ ছিল যে তা মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ করে ফেলেছিল। নিমিষেই পুরো সামুদ জাতি তাদের পাহাড় কেটে বানানো মযবুত ঘরের অভ্যন্তরেই উপুড় হয়ে মরে রইল। কোনো স্থাপত্য শিল্প বা কোনো সামরিক শক্তি তাদের রক্ষা করতে পারল না।

পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে গেল যেন সেখানে তারা কোনোদিন বসবাসই করেনি। তবে মহান আল্লাহ সালিহ (আ.) এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী মুষ্টিমেয় ঈমানদার বান্দাকে তাঁর বিশেষ রহমতে ও নিরাপত্তার চাদরে রক্ষা করেছিলেন। হিজর বা মাদায়েন সালিহ-এর সেই বিরান ধ্বংসস্তূপ আজও কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের মানুষের জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা ও সত্য প্রত্যাখ্যানের এক জীবন্ত ও করুণ শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নবি করীম (সা.) তাবুকের যুদ্ধের সময় যখন হিজর এলাকা অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় এবং দ্রুত এলাকাটি পার হন, যেন সেই অভিশপ্ত জাতির ওপর আসা গজব তাদের স্পর্শ না করে।