Islamic Story

হযরত নূহ (আ.)-এর কিশতি: ৯৫০ বছরের দাওয়াত ও মহাপ্লাবনের ঐতিহাসিক ঘটনা

Can Prophet Nuh change your heart today? Discover patience in dawah, endurance, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthen.

হযরত নূহ (আ.)-এর কিশতি: ৯৫০ বছরের দাওয়াত ও মহাপ্লাবনের ঐতিহাসিক ঘটনা

গল্পের শিক্ষা

নূহ (আঃ)-এর জীবনগাঁথা থেকে আমাদের শিক্ষা হলো যে, দীর্ঘ সময় এবং প্রতিকূল পরিবেশেও ধৈর্য ধরে সত্যের পথে অবিচল থাকতে হয়। মানুষের সংখ্যা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যই সফলতার মাপকাঠি। যারা আল্লাহর অবাধ্য হয় এবং অহঙ্কার প্রদর্শন করে, বংশীয় পরিচয় বা দুনিয়াবি ক্ষমতা তাদের রক্ষা করতে পারে না, যা নূহ (আঃ)-এর পুত্রের ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়।

Beginning

মানব ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘতম অধ্যায়ের নাম হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর জীবন এবং তাঁর নবুওয়াত। আদম (আঃ)-এর দশ প্রজন্ম পরে যখন মানুষের মধ্যে শিরক ও মূর্তিপূজার প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন আল্লাহ তাআলা নূহ (আঃ)-কে তাঁর কওমের জন্য একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত করেন। ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুযায়ী, এটিই ছিল পৃথিবীতে শিরকের প্রথম সূচনা।

নূহ (আঃ) ছিলেন প্রথম 'উলুল আযম' বা দৃঢ়পদ সংকল্পসম্পন্ন রাসূলদের একজন। তিনি তাঁর জাতিকে সতর্ক করে বলেছিলেন, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ নেই।

তবুও কি তোমরা ভয় করবে না?" (সূরা আল-মু'মিনুন, আয়াত: ২৩)। নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতের সময়কাল ছিল বিস্ময়কর। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে সাড়ে নয়শ (৯৫০) বছর অবস্থান করেছিলেন (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ১৪)।

এই দীর্ঘ সময় তিনি একক আল্লাহর তাওহীদের বাণী প্রচার করেন। তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতি ছিল বৈচিত্র্যময় যা সূরা নূহে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, "হে আমার প্রতিপালক!

আমি আমার সম্প্রদায়কে রাতে ও দিনে দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের কেবল বিমুখতাই বৃদ্ধি করেছে" (সূরা নূহ, আয়াত: ৫-৬)। তিনি কখনও উচ্চস্বরে প্রকাশ্য জনাকীর্ণ স্থানে, আবার কখনও একান্ত নিভৃতে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সত্যের ডাক দিয়েছেন।

তিনি তাদের কেবল পরকালের ভয় দেখাননি, বরং দুনিয়াবী বরকতের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো তবে আল্লাহ আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে সাহায্য করবেন (সূরা নূহ, আয়াত: ১০-১২)। কিন্তু নূহ (আঃ)-এর জাতির প্রতিক্রীয়ায় ফুটে উঠেছিল চরম ধৃষ্টতা।

The Test

বিত্তবান ও অহঙ্কারী নেতারা সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত করত ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগূস, ইয়াঊক ও নাসর নামক পাঁচজন পুণ্যবান ব্যক্তির স্মরণে নির্মিত মূর্তিদের পূজা করতে। যখন নূহ (আঃ) তাদের মূর্তিপূজা ছাড়তে বললেন, তখন তারা তাদের কানে আঙুল চেপে ধরত এবং কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলত যাতে সত্যের বাণী তাদের স্পর্শ না করে। তারা নূহ (আঃ)-কে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলত যে, তাঁর অনুসারীরা কেবল সমাজের নিচু ও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ।
তারা যুক্তি দিত, "আমরা কেবল তোমাকে আমাদের মতোই একজন মানুষ হিসেবে দেখছি। আমাদের মধ্যে যারা অতি অধম, তারা ছাড়া আর কেউ তোমার আনুগত্য করছে এমনটিও দেখছি না" (সূরা হুদ, আয়াত: ২৭)। এমনকি তারা তাঁকে উন্মাদ সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে এবং পাথর মেরে হত্যার হুমকি দেয়।

দীর্ঘ নয়শ পঞ্চাশ বছরের ক্লান্তিহীন সংগ্রামের পর যখন তাদের অবাধ্যতা ও কুফর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন নূহ (আঃ) আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেন। আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে দেন যে, ইতিপূর্বে যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আর কেউ নতুন করে বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও কুফরের শিক্ষা দিচ্ছিল।

নূহ (আঃ) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, "হে আমার প্রতিপালক!

আপনি পৃথিবীর বুকে কাফেরদের মধ্য থেকে কাউকেও বসবাসকারী হিসেবে অবশিষ্ট রাখবেন না" (সূরা নূহ, আয়াত: ২৬)। এই দোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা নূহ (আঃ)-কে একটি বিশাল জাহাজ বা নৌকা (আরক) নির্মাণের নির্দেশ দেন। আল্লাহর নির্দেশ ছিল: "আমার তদারকিতে ও আমার নির্দেশ মোতাবেক নৌকা নির্মাণ করো" (সূরা হুদ, আয়াত: ৩৭)।

মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর পাহাড়ের পাদদেশে যখন নূহ (আঃ) কাঠ ও পেরেক দিয়ে বিশাল জাহাজটি তৈরি করছিলেন, তখন তাঁর সম্প্রদায়ের জাঁদরেল নেতারা পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় উপহাস করত। তারা বলত, "নূহ, এখন তুমি নবী থেকে কাঠমিস্ত্রি হয়ে গেলে?" নূহ (আঃ) অটল থেকে উত্তর দিতেন, "আজ যদি তোমরা আমাদের উপহাস করো, তবে অচিরেই আমরা তোমাদের ওপর উপহাস করব যেমনটি তোমরা করছ" (সূরা হুদ, আয়াত: ৩৮)। জাহাজটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে আল্লাহর শাস্তির প্রথম লক্ষণ দেখা দিল।

'তান্নুর' বা ভূগর্ভস্থ উনুন থেকে পানির প্রস্রবণ প্রবলভাবে উথলে উঠতে লাগল। আল্লাহ নূহ (আঃ)-কে নির্দেশ দিলেন প্রতিটি প্রাণীর একজোড়া (একটি পুরুষ ও একটি মাদী) করে নৌকায় তুলে নিতে। সেই সঙ্গে তাঁর অনুসারী ঈমানদারদের এবং তাঁর পরিবারকে (যারা কুফরের ওপর অটল ছিল তারা ব্যতীত) আরোহণ করতে বললেন।

The Lesson

হঠাৎ আকাশ ও পৃথিবীর মিলন ঘটল এক ধ্বংসাত্মক প্লাবনে। আকাশ থেক প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হলো যা কুরআনের ভাষায় 'আকাশের দরজা উন্মুক্ত' হওয়ার মতো। জমিনের বুক চিরে ফিনকি দিয়ে পানি বের হতে লাগল।
ফলে মহাপ্রলয় শুরু হলো যা সমস্ত উঁচু পাহাড়কেও গ্রাস করে ফেলল। সেই উত্তাল তরঙ্গের মাঝে নূহ (আঃ) তাঁর এক পুত্রকে দেখতে পেলেন যে ঈমান আনেনি। পিতাসুলভ মমতায় তিনি তাকে ডাকলেন, "হে বৎস!

আমাদের সঙ্গে আরোহণ করো এবং কাফেরদের সঙ্গী হিয়ো না" (সূরা হুদ, আয়াত: ৪২)। কিন্তু অবাধ্য পুত্র দম্ভ করে বলল যে, সে কোনো এক সুউচ্চ পাহাড়ে আশ্রয় নেবে যা তাকে পানি থেকে বাঁচাবে। কিন্তু পরক্ষণেই এক প্রলয়ঙ্কারী ঢেউ তাঁকে তলিয়ে নিয়ে গেল।

নূহ (আঃ) অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে আল্লাহর কাছে তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা বিষয়ে আরজি জানালে আল্লাহ শিক্ষা দিলেন যে, যে কাফের সে পৈতৃক সম্পর্কে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হলেও রূহানি বা আদর্শিক সম্পর্কে পরিবারের অংশ নয়। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় পাওয়া যায়, এটি ছিল মানুষের বিশ্বাসের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে থাকার এক সুমহান দৃষ্টান্ত। এই প্রলয়ঙ্করী প্লাবনে নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

দুনিয়ার বুক থেকে শিরক ও মূর্তিপূজার নামনিশানা মুছে গেল। দীর্ঘদিন জাহাজটি সেই পানির প্রবাহে ভাসতে লাগল। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে আকাশ তার বারিধারা বন্ধ করল এবং জমিন তার পানি শুষে নিল।

জাহাজটি ইরাকের 'জুদী' নামক পাহাড়ের ওপর এসে স্থির হলো। আল্লাহ ঘোষণা করলেন, "হে নূহ!

নেমে আসো আমার পক্ষ থেকে শান্তি ও সেই বরকতসমূহ নিয়ে যা তোমার ওপর ও তোমার সাথে থাকা সম্প্রদায়ের ওপর বর্ষিত হবে" (সূরা হুদ, আয়াত: ৪৮)। নূহ (আঃ)-কে বলা হয় 'আদম-এ সানি' বা দ্বিতীয় আদম, কারণ এই মহাপ্লাবনের পর নূহ (আঃ)-এর সাথে থাকা ব্যক্তিদের বংশধর থেকেই বর্তমান পৃথিবীতে মানব জাতির পুনর্জন্ম বা বিস্তার শুরু হয়েছে। হযরত নূহ (আঃ)-এর এই মহিমান্বিত উপাখ্যান থেকে মানবজাতি আজীবন শিক্ষা পায় যে, সত্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে এবং দাওয়াতের পথ অনেক দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু বিজয় শেষ পর্যন্ত একমাত্র মুমিনদেরই হয়।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন নূহ (আঃ)-এর জাতি যখন আল্লাহর কাছে বলবে যে তাদের কাছে কেউ দাওয়াত নিয়ে যায়নি, তখন উম্মতে মুহাম্মদী নূহ (আঃ)-এর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এই কাহিনী আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, কুফরীর ভয়াবহ পরিণাম এবং ধৈর্যের সাথে সত্য প্রচারের এক অমর নিদর্শন।