Islamic Story

হযরত মুসা (আ.) ও তূর পাহাড়: আল্লাহর সাথে কথোপকথন ও মোজেজার বিস্ময়কর ইতিহাস

Can Prophet Musa change your heart today? Discover courage before tyranny and trust in divine help in a Quran-based story that stirs reflection and strengthen.

হযরত মুসা (আ.) ও তূর পাহাড়: আল্লাহর সাথে কথোপকথন ও মোজেজার বিস্ময়কর ইতিহাস

গল্পের শিক্ষা

ইমান ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে অজেয়কে জয় করা সম্ভব এবং দম্ভ ও জুলুমের শেষ পরিণতি পরাজয় ও ধ্বংস।

Beginning

হাজার বছর আগে মিশরের শাসনভার যখন দম্ভ ও অহংকারের প্রতীক ফেরাউনের হাতে ছিল, তখন সেই জনপদে বনী ইসরায়েল জাতি চরম নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছিল। ফেরাউন নিজেকে ঈশ্বর দাবি করত এবং তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সে বনী ইসরায়েলের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যার এক পৈশাচিক নির্দেশ জারি করেছিল। ঠিক সেই কঠিন প্রেক্ষাপটে মুসা (আঃ) এর জন্ম হয়।

সূরা আল-কাসাসে (২৮:৭-১৩) বর্ণিত হয়েছে যে, যখন তার মা তওহীদের ওপর অটল থেকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী শিশু মুসাকে একটি সিন্দুকে ভরে নীলনদে ভাসিয়ে দেন। এই সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহর কুদরত কার্যকর হয় এবং সেই সিন্দুকটি ভাসতে ভাসতে ফেরাউনের রাজপ্রাসাদের পাশেই গিয়ে থামে। ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া শিশুটির মায়াবী চেহারা দেখে মুগ্ধ হন এবং তাকে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

এভাবে যার হাত থেকে বাঁচার জন্য ফেরাউন হাজার হাজার শিশু হত্যা করছিল, সেই গৃহেই স্বয়ং মুসা (আঃ) আল্লাহর তত্ত্বাবধানে বড় হতে থাকেন। যৌবনে পদার্পণের পর মুসা (আঃ) এক অভাবনীয় ঘটনার সম্মুখীন হন। তিনি একজন কিবতী সৈন্য ও একজন বনী ইসরায়েলি ব্যক্তির বিবাদ মেটাতে গিয়ে কিবতীকে একটি চড় মারেন, যার ফলে তার মৃত্যু ঘটে (সূরা আল-কাসাস ২৮:১৫)।

যদিও এটি একটি অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড ছিল, তবুও ফেরাউনের বাহিনীর পক্ষ থেকে শাস্তির ভয়ে তিনি মিশর ত্যাগ করে দূরবর্তী শহর মাদিয়ানের দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি হযরত শুয়াইব (আঃ) এর সান্নিধ্যে দশ বছর অবস্থান করেন, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং নবুওয়াতের দায়িত্ব প্রাপ্তির জন্য আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত হন (সূরা আল-কাসাস ২৮:২৩-২৮)। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে সপরিবারে মিশরে ফেরার পথে সিনাই পর্বতের তূরের কাছে আল্লাহ তাকে আগুনের রূপক শিখার মাধ্যমে সম্বোধন করেন।

The Test

সূরা ত্বহা (২০:৯-১৪) এবং সূরা আল-কাসাস (২৮:২৯-৩০) অনুযায়ী, সেখানে আল্লাহ তাকে নবুওয়াত দান করেন এবং সরাসরি কথা বলেন। আল্লাহ তাকে দুটি অভাবনীয় অলৌকিক নিদর্শন প্রদান করেন: প্রথমত, তার হাতের লাঠি যা নিক্ষেপ করলে জীবন্ত সাপে রূপান্তরিত হতে পারে এবং দ্বিতীয়ত, তার ‘ইয়াদে বায়দা’ বা নূরানি হাত যা বগলের নিচে রেখে বের করলে কোনো রোগ ছাড়াই সূর্যের মতো উজ্জ্বল আলো ছড়ায়। আল্লাহ তাকে স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন ফেরাউনের নিকট গিয়ে তাকে এক আল্লাহর আনুগত্য ও সত্যের দাওয়াত দিতে এবং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে বনী ইসরায়েলকে মুক্তি দিতে।
মুসা (আঃ) তার নিজের কিছুটা জড়তা কাটানোর জন্য এবং আল-কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তার ভাই হারুন (আঃ) কে সাহায্যকারী হিসেবে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ তাদের আবেদন কবুল করলেন এবং তারা উভয়ে ফেরাউনের দরবারে উপস্থিত হলেন। মহা প্রতাপশালী ফেরাউনের সামনে দাঁড়িয়ে তারা অকুতোভয়ে তাকে এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং বনী ইসরায়েলের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করার আহ্বান জানালেন (সূরা আশ-শুআরা ২৬:১৬-১৭)।

ফেরাউন এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তাকে জাদুকর ও উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করল এবং অতীতে তার লালন-পালনের কথা তুলে তাকে খোঁটা দিল। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে ফেরাউন তার রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুকরদের তলব করল এক প্রকাশ্য প্রতিযোগিতার জন্য। সূরা ত্বহা (২০:৫৮-৬৪) অনুযায়ী, একটি উৎসবের দিনে বিশাল জনসমাবেশে জাদুকররা তাদের দড়ি ও লাঠি দিয়ে কৃত্রিম সাপের চাক্ষুষ বিভ্রম তৈরি করল।

তাদের জাদুর প্রভাবে মানুষের চোখে তা মনে হচ্ছিল যেন অনেক সাপ ছুটোছুটি করছে। মুসা (আঃ) আল্লাহর আদেশে তার লাঠিটি নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তা একটি বিশাল বাস্তব অজগরে পরিণত হলো এবং জাদুকরদের সমস্ত অলীক ও মিথ্যা সৃষ্টিকে নিমেষেই গ্রাস করে ফেলল। এটি যে কোনো মানুষের তৈরি জাদু নয় বরং ঐশ্বরিক মোজেজা, তা মুহূর্তেই বিজ্ঞ জাদুকররা বুঝতে পারল।

তারা সেখানেই সিজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং ঘোষণা করল যে তারা মুসা ও হারুনের রবের ওপর ঈমান এনেছে (সূরা আশ-শুআরা ২৬:৪৬-৪৮)। রাগান্বিত ফেরাউন তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে শূলে চড়ানোর হুমকি দিলেও ঈমানের দৃঢ়তায় তারা অবিচল রইল এবং পরকালীন জীবনের কামনায় সেই শাস্তি মেনে নিতে পিছপা হলো না। কিন্তু ফেরাউন ও তার পারিষদবর্গ হেদায়েত গ্রহণ করার বদলে আরও কঠোরভাবে বনী ইসরায়েলের ওপর জুলুম বাড়িয়ে দিল।

The Lesson

ধারাবাহিক গজব যেমন রক্ত, প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন ও ব্যাঙের উপদ্রব আসা সত্ত্বেও তারা ঈমান আনল না। অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ফয়সালা আসার সময় হলো। আল্লাহর ওহী অনুযায়ী মুসা (আঃ) রাতারাতি বনী ইসরায়েলকে নিয়ে গোপনে মিশর ত্যাগের সংকল্প করলেন।
তারা যখন লোহিত সাগরের উপকূলে পৌঁছালেন, তখন সূর্যোদয়ের সময় পেছন থেকে ফেরাউন তার সুসজ্জিত বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের ঘিরে ফেলল। সামনে উত্তাল অগাধ সমুদ্র আর পেছনে রক্তপিপাসু দুর্ধর্ষ বাহিনী—এমন এক অবরুদ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় বনী ইসরায়েলের লোকেরা নিরাশ হয়ে চিৎকার করে বলল, "আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!" (সূরা আশ-শুআরা ২৬:৬১-৬২)। কিন্তু মুসা (আঃ) অবিচল ঈমানের সাথে বললেন, "কখনোই নয়!

অবশ্যই আমার প্রতিপালক আমার সাথে আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।" তৎক্ষণাৎ আল্লাহর নির্দেশ আসলো, মুসা (আঃ) তার সেই মোজেজাপূর্ণ লাঠি দ্বারা সাগরের পানিতে আঘাত করলেন। সাথে সাথে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য ফুটে উঠল; সাগরের পানি দুই পাশে পাহাড়ের ন্যায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং মাঝখানে বনী ইসরায়েলের বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি শুষ্ক রাস্তা তৈরি হলো (সূরা আশ-শুআরা ২৬:৬৩)। মুসা (আঃ) এবং বনী ইসরায়েল নির্বিঘ্নে সেই সমুদ্র পার হয়ে নিরাপদ ভূমিতে অর্থাৎ সিনাই প্রান্তরে পৌঁছাল।

অন্যদিকে দম্ভভরে ও অন্ধ আক্রোশে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী সেই শুকনো রাস্তায় দ্রুতবেগে নেমে পড়ল। তারা যখন সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে পৌঁছাল এবং বনী ইসরায়েলের শেষ ব্যক্তিটি তীরে উঠল, তখন আল্লাহর হুকুমে সাগরের স্থির পানি পুনরায় পর্বতসম বেগে মিলিত হয়ে গেল। চোখের পলকে দুনিয়ার প্রবল প্রতাপশালী সম্রাট ফেরাউন তার বিশাল বাহিনীসহ অতল সমুদ্রের গর্ভে নিমজ্জিত হলো।

মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে যখন সে লোনা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন সে ঘোষণা করল, "আমি ঈমান আনলাম যে বনী ইসরায়েল যার ওপর ঈমান এনেছে তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই" (সূরা ইউনুস ১০:৯০)। কিন্তু তার সেই তওবা কবুল করা হলো না। ইবনে কাসীরের বর্ণনা ও কুরআনের আয়াত অনুযায়ী, আল্লাহ তার দেহকে পরবর্তী যুগের নিদর্শন হিসেবে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন যা আধুনিক বিজ্ঞানেও প্রমাণিত।

এভাবেই আল্লাহ্ তাআলা মুসা (আঃ) এর মাধ্যমে বনী ইসরায়েলকে দীর্ঘ দুই শতকেরও বেশি সময়ের অমানুষিক দাসত্ব ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিলেন এবং সত্যের চূড়ান্ত বিজয় প্রতিষ্ঠিত করলেন। সূরা ত্বহা, আশ-শুআরা এবং আল-কাসাসের আয়াতসমূহে বর্ণিত এই ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রাম কেবল একটি জাতির স্বাধীনতাই নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে আল্লাহর কুদরতের সামনে কোনো পার্থিব শক্তিই টিকে থাকতে পারে না। মুসা (আঃ) এর এই মিশন ছিল বাতিলের বিরুদ্ধে হকের চিরন্তন বিজয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য সত্যের পথে অবিচল থাকার অসিলা হয়ে থাকবে।