Islamic Story

হযরত ঈসা (আ.) ও মোজেজা: অন্ধকে দৃষ্টিদান ও মৃতকে জীবিত করার অলৌকিক ক্ষমতা

Can Prophet Isa change your heart today? Discover purity, miracles, and trust in Allah’s decree in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens f.

হযরত ঈসা (আ.) ও মোজেজা: অন্ধকে দৃষ্টিদান ও মৃতকে জীবিত করার অলৌকিক ক্ষমতা

গল্পের শিক্ষা

আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস এবং সতীত্ব বজায় রাখলে আল্লাহ কঠিনতম পরীক্ষায়ও অলৌকিক সাহায্য প্রদান করেন। ঈসা (আঃ)-এর জন্ম প্রমাণ করে যে আল্লাহ সকল জাগতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে এবং তিনি যা ইচ্ছা তা-ই সৃষ্টি করতে পারেন।

Beginning

মানবজাতির ইতিহাসে সতীত্ব, আধ্যাত্মিকতা এবং আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরান এবং সূরা মারইয়ামে মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ মর্যাদা ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অলৌকিক জন্মবৃত্তান্ত বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এই কাহিনী কেবল একজন মহীয়সী নারীর জীবনগাথা নয়, বরং এটি আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা এবং কুদরতের এক জীবন্ত দলিল।

**পারিবারিক পটভূমি ও নির্জনতা অবলম্বন:** মারইয়াম (আঃ) ছিলেন ইমরান ও হান্নাহর কন্যা। জন্মলগ্ন থেকেই তিনি আল্লাহর ইবাদতের জন্য উৎসর্গীকৃত ছিলেন। তিনি বাইতুল মাকদিসের সেবায় নিয়োজিত একজন অত্যন্ত পবিত্র ও একনিষ্ঠ ইবাদতকারী নারী হিসেবে বেড়ে ওঠেন।

সূরা মারইয়ামের ১৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, "স্মরণ করো এই কিতাবে মারইয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকের এক নির্জন স্থানে আশ্রয় নিল।" ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সেখানে পর্দার আড়ালে নিজেকে ইবাদতে মগ্ন রাখতেন যাতে কেউ তাঁর ইবাদতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। এই নির্জনতা ছিল তাঁর রবের নৈকট্য লাভের এক বিশেষ মাধ্যম। **জিবরাঈল (আঃ)-এর আগমন ও মারইয়াম (আঃ)-এর প্রতিক্রিয়া:** এমন এক নিভৃত সময়ে, যখন তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন, তখন ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) একজন সুঠামদেহী ও ত্রুটিমুক্ত মানুষের বেশে তাঁর সামনে আবির্ভুত হন।

একজন অপরিচিত যুবককে এমন নির্জন স্থানে দেখে মারইয়াম (আঃ) বিচলিত ও ভীত হয়ে পড়েন। এটি ছিল তাঁর উচ্চতর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সতীত্বের তাৎক্ষণিক প্রমাণ। তিনি কোনো প্রলোভনে পা না দিয়ে সরাসরি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করলেন।

কুরআনের ভাষায় তিনি বললেন, "আমি তোমার থেকে পরম করুণাময় আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি, যদি তুমি আল্লাহকে ভয় করো" (সূরা মারইয়াম: ১৮)। এই উক্তি প্রমাণ করে যে, তিনি চরম সংকটে এবং ভয়ের মুহূর্তেও আল্লাহর কথা ভুলে যাননি। তাঁর এই তাকওয়া ছিল মুমিনাহ নারীদের জন্য এক চিরন্তন আদর্শ।

The Test

**অলৌকিক সুসংবাদ ও মানবিক বিস্ময়:** জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, "আমি তো কেবল তোমার রবের প্রেরিত দূত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্রসন্তান দান করতে পারি" (সূরা মারইয়াম: ১৯)। এই অলৌকিক ঘোষণা শুনে মারইয়াম (আঃ) বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, "কীভাবে আমার পুত্রসন্তান হবে, যখন কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিশারিণীও নই?" (সূরা মারইয়াম: ২০)। এটি ছিল একজন মানুষের জাগতিক প্রেক্ষাপট থেকে যুক্তিসঙ্গত সংশয়।
প্রতি উত্তরে জিবরাঈল (আঃ) আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, "এভাবেই হবে; তোমার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্য অত্যন্ত সহজসাধ্য কাজ। আর আমরা তাকে মানুষের জন্য এক নিদর্শন এবং আমাদের পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ করতে চাই" (সূরা মারইয়াম: ২১)। তাফসির ইবনে কাসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে পিতা-মাতা ছাড়া, হাওয়া (আঃ)-কে পুরুষ থেকে নারী ছাড়া, আর ঈসা (আঃ)-কে নারী থেকে পুরুষ ছাড়া—যাতে আল্লাহর সৃজনশীল ক্ষমতার পূর্ণতা প্রকাশিত হয়।

**গর্ভধারণ ও প্রসবকালীন পরীক্ষা:** এরপর জিবরাঈল (আঃ) তাঁর পরিধেয় বস্ত্রের সম্মুখভাগে ফুঁ দিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে (কুন ফায়াকুন) তিনি গর্ভবতী হলেন। সহীহ তাফসির অনুযায়ী, এই ফুঁ ছিল মহান আল্লাহর সেই রূহ যা তিনি মারইয়ামের গর্ভে স্থাপন করেছিলেন। গর্ভাবস্থার সময় অতিবাহিত হওয়ার পর যখন প্রসববেদনা শুরু হলো, তখন তিনি সামাজিক লজ্জা ও অপবাদের আশঙ্কায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন।

তিনি একটি শুকনো খেজুর গাছের কাণ্ডের নিচে আশ্রয় নিলেন এবং মানসিকভাবে এতই বিধ্বস্ত ছিলেন যে বলে উঠলেন, "হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে চিরতরে মুছে যেতাম!" (সূরা মারইয়াম: ২৩)। একজন সতী নারীর জন্য সতীত্বের ওপর অপবাদ আসা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন, এই আয়াতটি তারই প্রতিফলন।

**ঐশী সাহায্য ও প্রশান্তি:** বিপদের এই মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে একা ছেড়ে দেননি। ফেরেশতার মাধ্যমে নিচ থেকে আওয়াজ এলো, "তুমি চিন্তিত হয়ো না, তোমার রব তোমার পাদদেশে একটি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করেছেন। আর তুমি খেজুর গাছের কাণ্ডটি ধরে নাড়া দাও, তোমার ওপর তা তাজা ও পাকা খেজুর ফেলবে" (সূরা মারইয়াম: ২৪-২৫)।

এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ কুদরত—শুকনো কাণ্ড থেকে তাজা ফল বের হওয়া এবং নির্জন মরুভূমিতে পানির ব্যবস্থা হওয়া। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন তৃপ্তিভরে খেতে, পান করতে এবং চক্ষু শীতল করতে। সাথে এই উপদেশও দিলেন যে, যদি কোনো মানুষ প্রশ্ন করে, তবে তিনি যেন রোজা বা মৌনতা অবলম্বনের ইশারা দেন।

The Lesson

**স্বজাতির সামনে প্রত্যাবর্তন ও অলৌকিক শিশু:** মারইয়াম (আঃ) যখন নবজাতক ঈসা (আঃ)-কে কোলে নিয়ে তাঁর কওমের কাছে ফিরে আসলেন, তখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। লোকেরা তাকে ঘিরে ধরল এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলতে লাগল, "হে হারূণের বোন! তোমার পিতা তো অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মা-ও তো ব্যভিচারিণী ছিলেন না!" (সূরা মারইয়াম: ২৮)। এই অপবাদ ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। মারইয়াম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী কোনো কথা না বলে শিশুটির দিকে ইঙ্গিত করলেন।

লোকেরা উপহাস করে বলল, "দোলনায় থাকা শিশুর সাথে আমরা কীভাবে কথা বলব?" ঠিক সেই মুহূর্তে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলৌকিক ঘটনাটি ঘটল। দোলনায় থাকা শিশু ঈসা (আঃ) আল্লাহর কুদরতে কথা বলে উঠলেন: "নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন" (সূরা মারইয়াম: ৩০)।

তিনি আরও বললেন যে, আল্লাহ তাঁকে মাতার প্রতি অনুগত এবং বরকতময় করেছেন। এই ভাষণের মাধ্যমে ঈসা (আঃ) তাঁর মায়ের পবিত্রতা ঘোষণা করলেন এবং বনী ইসরাঈলের সকল অভিযোগের মুখ বন্ধ করে দিলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বিভিন্ন বর্ণনায় ঈসা (আঃ)-কে ঐশী বাণী বা 'কালিমাতুল্লাহ' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা সরাসরি আল্লাহর আদেশ থেকে সৃষ্টি।

**শিক্ষা ও গুরুত্ব:** মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর এই মহিমান্বিত কাহিনী আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে: ১. **তাকওয়া ও সতীত্ব:** আল্লাহর প্রতি ভয় ও নিজের চরিত্র রক্ষা করা মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ২.

**তাওয়াক্কুল:** যখন পৃথিবীর সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনো আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। ৩. **আল্লাহর কুদরত:** জাগতিক উপায়-উপকরণ ছাড়াও আল্লাহ যেকোনো কাজ করতে সক্ষম। ৪.

**নারীর মর্যাদা:** সূরা আল-ইমরানের ৪২ নং আয়াতে ফেরেশতারা বলেছিলেন, "হে মারইয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের সকল নারীর ওপর তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।" তাফসির ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মারইয়াম (আঃ)-এর এই ধৈর্যের ফল ছিল জান্নাতের বিশেষ মর্যাদা। তিনি ছিলেন 'সিদ্দিকাহ' বা চিরসত্যবাদী। ঈসা (আঃ)-এর জন্ম কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল আল্লাহর অস্তিত্বের এক পরম নিদর্শন (Ayat), যা বিচার দিবস পর্যন্ত মানবজাতির জন্য সত্যের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। পরিশেষে বলা যায়, মারইয়াম (আঃ)-এর জীবন আমাদের শেখায় যে, পবিত্রতা ও সত্যের পথে থাকলে স্বয়ং আল্লাহ সাহায্যকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে সম্মানের আসনে আসীন করেন।