Islamic Story

ইব্রাহিম (আ.) ও কাবা নির্মাণ: মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে এক একনিষ্ঠ নবীর সংগ্রাম

Can Prophet Ibrahim change your heart today? Discover tawhid, sacrifice, and complete trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strength.

ইব্রাহিম (আ.) ও কাবা নির্মাণ: মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে এক একনিষ্ঠ নবীর সংগ্রাম

গল্পের শিক্ষা

হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর জীবন থেকে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ শিক্ষা হলো যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে একা থাকলেও সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। দুনিয়ার কোনো শক্তিই মুমিনের ক্ষতি করতে পারে না যদি আল্লাহ তা রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। ঈমানের পরীক্ষায় 'হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল' হলো মুমিনের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র।

Beginning

হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন মিল্লাতে মুসলিমার পিতা এবং আল্লাহর একনিষ্ঠ প্রতিনিধি। তাঁর জীবনের সূচনা হয়েছিল এমন এক যুগে এবং পরিবেশে যেখানে মানুষ মূর্তিপূজা এবং সৌরশক্তির উপাসনায় লিপ্ত ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনআমের ৭৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) প্রথমে তাঁর পিতা আযরকে মূর্তিপূজার অসারতা সম্পর্কে সতর্ক করেন।

তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পিতাকে প্রশ্ন করেছিলেন কেন তিনি এমন জিনিসের পূজা করেন যা শোনে না, দেখে না এবং কোনো উপকারও করতে পারে না। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর শৈশব থেকেই ছিলেন সুতীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধির অধিকারী। ইবনে কাসীরের বর্ণনা মতে, তিনি পরিবেশের পারিপার্শ্বিকতা পর্যবেক্ষণ করে তাওহীদের মূল সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করতেন।

যখন তাঁর ওপর রাতের অন্ধকার ছেয়ে গেল, তখন তিনি একটি জ্বলজ্বলে নক্ষত্র দেখে বললেন যে এটিই হতে পারে আমার পালনকর্তা। কিন্তু নক্ষত্রটি ডুবে গেলে তিনি ঘোষণা করলেন যে, তিনি অস্তমিত হওয়া বস্তুকে পছন্দ করেন না। এরপর তিনি চাঁদ এবং সূর্যকে উদিত হতে দেখে একই যুক্তির অবতারণা করলেন।

সূর্য যখন ডুবে গেল, তখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের সামনে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করলেন যে, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যেসব বস্তুকে আল্লাহর শরীক করো, আমি তা থেকে মুক্ত। আমি কেবল সেই সত্তার দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এইভাবে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যুক্তি ও নিদর্শনের মাধ্যমে নক্ষত্র পূজার অসারতা প্রমাণ করেন।

The Test

তিনি তাঁর জাতির সাথে বিতর্কে লিপ্ত হন এবং তাদের বুঝিয়ে দেন যে প্রকৃত ক্ষমতা কেবল আল্লাহরই হাতে। সূরা আল-আম্বিয়ার ৫১ থেকে ৭০ আয়াতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামের বর্ণনা পাওয়া যায় যেখানে তিনি নিজ জাতির হাতে পূজিত মূর্তিদের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) লক্ষ্য করলেন যে তাঁর সম্প্রদায় তাদের হাতে গড়া মূর্তিদের ভয়ে এবং শ্রদ্ধায় নতজানু থাকে।
তিনি জানতেন এই জড় পদার্থগুলোর কোনো প্রাণ বা ক্ষমতা নেই। একদিন যখন তাঁর জাতির লোকেরা একটি বড় উৎসবে গ্রাম ছেড়ে বাইরে চলে গিয়েছিল, তখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে সেখানে রয়ে গেলেন। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় উৎসব শুরুর আগের দৃশ্য চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

যখন শহর জনশূন্য হয়ে পড়ল, তখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) সেই উপাসনালয়ে প্রবেশ করলেন যেখানে অসংখ্য মূর্তিকে ভোগ নিবেদন করে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি মূর্তিদের উপহাস করে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা খাচ্ছ না কেন? তোমাদের কী হয়েছে যে কথা বলছ না?

এরপর তিনি একে একে সব মূর্তি ভেঙে চুরমার করে দিলেন। তবে কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে অক্ষত রাখলেন এবং কুঠারটি তার কাঁধে ঝুলিয়ে দিলেন। উৎসব শেষে লোকেরা ফিরে এসে যখন তাদের উপাস্যদের এই দশা দেখল, তখন তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে তলব করল।

তারা জিজ্ঞেস করল, হে ইবরাহীম, তুমি কি আমাদের উপাস্যদের সাথে এমন আচরণ করেছ? ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) উত্তরে বললেন, বরং এদের এই বড়টিই তো এক কাজ করেছে, তাকেই জিজ্ঞেস করো যদি সে কথা বলতে পারে। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর এই শানিত যুক্তিতে তারা ক্ষণিকের জন্য লজ্জিত হয়ে মাথানত করল এবং স্বীকার করল যে এই মূর্তিগুলো কথা বলতে পারে না।

কিন্তু তাদের অহংকার তাদের সত্য গ্রহণে বাধা দিল। তারা যুক্তি দিয়ে হার মানলেও পেশিশক্তির প্রয়োগ চাইল। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে।
নমরুদ ও তার অনুসারীরা একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত করল। ইবনে কাসীর উলেখ করেছেন যে এত বড় আগুন তৈরি করা হয়েছিল যে পাখির পক্ষেও তার ওপর দিয়ে ওড়া সম্ভব ছিল না। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুনের শিখায় নিক্ষেপ করার জন্য একটি বড় গুলতি বা মিনজানিক তৈরি করা হলো।

The Lesson

যখন তাঁকে বেঁধে আগুনের নিক্ষেপ করার প্রস্তুতি চূড়ান্ত, তখন আকাশের ফেরেশতারা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। সহীহ বুখারীর ৪৫৬৩ নম্বর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যে দুআটি পাঠ করেছিলেন তা হলো, হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল অর্থাৎ আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক। এটি ছিল তাঁর ঈমান এবং আল্লাহর ওপর অগাধ আস্থার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা।

আল্লাহ তাআলা তখন আগুনকে নির্দেশ দিলেন, হে আগুন, তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। আগুনের ধর্ম হলো দহন করা, কিন্তু স্রষ্টার আদেশে তা ফুলের বাগান সদৃশ শান্তিময় হয়ে গেল। তিনি দীর্ঘ সময় সেই আগুনের মাঝে অবস্থান করলেন এবং দেখা গেল কেবল তাঁকে বাঁধার দড়িগুলো পুড়ে ছাই হয়েছে কিন্তু তাঁর শরীরে একটি পশমেও আঁচ লাগেনি।

উপস্থিত জনতা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখল যে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আগুনের ভেতর থেকে সুস্থ অবস্থায় হেঁটে বেরিয়ে আসছেন। এই অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পরেও নমরুদ এবং তার কতিপয় অনুসারী সত্য বিমুখ থাকল। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বুঝতে পারলেন যে তাঁর মাতৃভূমিতে আর দাওয়াতের ক্ষেত্র অবশিষ্ট নেই।

তিনি ঘোষণা করলেন যে তিনি তাঁর রবের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করবেন, নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। এরপর তিনি লুত (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর স্ত্রী সারাকে নিয়ে শামের উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর এই অবিস্মরণীয় জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে প্রতিকূল পরিবেশে বা একাকী অবস্থায়ও সত্য প্রকাশ করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা একজন মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তিনি একাই একটি উম্মত হিসেবে গণ্য ছিলেন এবং তাঁর নবুওয়াত পরবর্তী সকল নবী ও কিতাবের উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তাঁর সেই সুমহান ত্যাগ ও অটল বিশ্বাসের ধারা কিয়ামত পর্যন্ত আসা সকল ঈমানদারের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর অগ্নিকুণ্ড থেকে অক্ষত বেরিয়ে আসা কেবল একটি অলৌকিক ঘটনাই ছিল না, বরং তা ছিল বাতিলের মস্তকে সত্যের চরম চপেটাঘাত যা কিয়ামত পর্যন্ত তাওহীদের বাণীকে সমুন্নত রাখবে।