Islamic Story
হযরত হুদ (আ.) ও আদ জাতি: গর্বিত জাতির পতন ও সত্যের জয়ের ইতিহাস
Can Prophet Hud change your heart today? Discover warning against arrogance and rejecting truth in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens f.
গল্পের শিক্ষা
আদ জাতির ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শারীরিক শক্তি বা স্থাপত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব আল্লাহর শাস্তির হাত থেকে কাউকে রক্ষা করতে পারে না যদি সেখানে ঈমান না থাকে। অহংকার আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়ার প্রধান কারণ। মানুষের উচিত পার্থিব সম্পদের বড়াই না করে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকা এবং সত্যের আহ্বানকারী নবীদের সুন্নাহ অনুসরণ করা।
Beginning
নুহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের পরবর্তী সময়ে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে আগমন ঘটে ‘আদ’ সম্প্রদায়ের। তারা বর্তমান ইয়েমেন ও ওমানের মধ্যবর্তী ‘আল-আহক্বাফ’ নামক বালুময় ও পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করত। এই জাতিটি ছিল শারীরিক গঠনে অত্যন্ত দীর্ঘকায়, শক্তিশালী এবং তারা স্থাপত্যবিদ্যায় অভাবনীয় পারদর্শী ছিল।
ইতিহাসবিদ ও মুফাসসির ইবনে কাসীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, প্লাবনের পর আদ জাতিই প্রথম পৃথিবীতে পুনরায় মূর্তিপূজার সূচনা করে। তাদের এই বিচ্যুতি, সীমাহীন অহংকার এবং খোদাদ্রোহিতার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা তাদেরই বংশোদ্ভূত ও তাদের ভাই হজরত হুদ (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। ### আদ জাতির শক্তি ও দম্ভের বর্ণনা কুরআনুল কারিমের সূরা আল-আ’রাফে (৭:৬৯) বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের নুহ (আ.)-এর পরবর্তী উত্তরাধিকারী বানিয়েছিলেন এবং তাদের শারীরিক কাঠামোকে অন্য সাধারণ মানুষের তুলনায় বিশেষ উচ্চতা ও শক্তি প্রদান করেছিলেন।
তারা এই শক্তির মোহে অন্ধ হয়ে মহান আল্লাহর ইবাদত করার পরিবর্তে পার্থিব জৌলুসে মত্ত হয়ে পড়ে। তারা প্রতিটি উঁচু স্থানে উপহাসের ছলে আকাশচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণ করত এবং এমনভাবে দুর্গ ও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করত যেন তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে (সূরা আশ-শুয়ারা ২৬:১২৮-১২৯)। তাদের এই স্থাপত্যশৈলী কেবল প্রয়োজন মেটানোর জন্য ছিল না, বরং তা ছিল অহংকার ও দম্ভের বহিঃপ্রকাশ।
তাদের আত্মবিশ্বাস এতই প্রবল ছিল যে তারা সদম্ভে ঘোষণা করত, “আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী আর কে আছে?” (সূরা হা-মীম ৪১:১৫)। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় পাওয়া যায়, তারা এতই শক্তিশালী ছিল যে তারা খালি হাতে বড় বড় পাথর উপড়ে ফেলতে পারত। ### হুদ (আ.)-এর তাওহীদি দাওয়াত ও নাসিহা হজরত হুদ (আ.) অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তাঁর জাতিকে একত্ববাদের পথে আহ্বান করেন।
The Test
সূরা হুদ (১১:৫০) অনুসারে তিনি বলেন, ‘হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য নেই। তোমরা কি পরহেজগার হবে না?’ তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদের এই ধন-সম্পদ, উদ্যান, ঝরনাধারা, সন্তান-সন্ততি এবং পশুপাল—সবই আল্লাহর দান।
তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা তাদের বিগত পাপাচারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। হুদ (আ.) বলেছিলেন, ‘হে আমার কওম!
তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসো; তাহলে তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের বর্তমান শক্তির সাথে আরও অধিক শক্তি বৃদ্ধি করে দেবেন’ (সূরা হুদ ১১:৫২)। তিনি তাদের বুঝিয়েছিলেন যে, তিনি এই উপদেশের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক বা বিনিময় চান না, তার পুরস্কার কেবল আল্লাহর কাছে। ### সম্প্রদায়ের চরম প্রত্যাখ্যান ও অবাধ্যতা হুদ (আ.)-এর নরম ও যৌক্তিক দাওয়াতের বিপরীতে আদ জাতির নেতৃস্থানীয়রা তাঁকে চরম অবজ্ঞার সাথে প্রত্যাখ্যান করে।
তারা তাকে 'নির্বোধ' (সাফাহাত) এবং 'মিথ্যুক' বলে আখ্যায়িত করে (সূরা আল-আ'রাফ ৭:৬৬)। তারা বলতে লাগল, “তুমি তো আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসোনি। আমরা কেবল তোমার কথায় আমাদের পিতৃপুরুষদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব না” (সূরা হুদ ১১:৫৩)।
তারা আরও দাবি করল যে, হুদ (আ.) হয়তো তাদের কোনো দেবতার অভিশাপে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়েছেন বা মস্তিষ্কবিকৃত হয়েছেন। হুদ (আ.) আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা প্রকাশ করে তাদের চ্যালেঞ্জ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, তাঁর রিজিক এবং নিরাপত্তা কেবল তাঁর রবের হাতেই নিহিত। তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে বলেন, "আমি তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি।
আমার রব চাইলে তোমাদের পরিবর্তে অন্য কোনো জাতিকেও স স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন।" আদ জাতি তখন আল্লাহর আজাব নিয়ে বিদ্রুপ শুরু করে। তারা বলতে থাকে—যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে নিয়ে আসো সেই আজাব যার কথা তুমি বারবার বলছ। ### মেঘখণ্ড ও আজাবের সূচনা যখন আদ জাতির অবাধ্যতা সীমা অতিক্রম করল, তখন তাদের অঞ্চলে দীর্ঘ তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে গেল।
খরায় তাদের সব শস্য ও চারণভূমি শুষ্ক হয়ে পড়ল। এরপর হঠাৎ একদিন তারা দিগন্তে এক বিশাল মেঘখণ্ড ঘনিয়ে আসতে দেখল। সূরা আল-আহক্বাফে (৪৬:২৪) বর্ণিত হয়েছে যে, যখন আজাব ঘনিভূত হল, তারা ভেবেছিল এটি রহমতের বৃষ্টি।
The Lesson
তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বলতে লাগল, “এটি সেই মেঘ যা আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে।” কিন্তু হুদ (আ.) তাদের বিভ্রম দূর করে সতর্কবাণী দিলেন, “না, এটি তোমাদের ত্বরান্বিত করা সেই আজাব; এটি এমন এক প্রলয়ঙ্কারী বায়ু যাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” ### চূড়ান্ত শাস্তি: সাত রাত ও আট দিনের ধ্বংসলীলা অবশেষে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এক অবিশ্বাস্য গতিসম্পন্ন ও আর্তনাদকারী শীতল ঘূর্ণিবায়ু বা ‘সর-সর’ তাদের ওপর আছড়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা এই বায়ুকে তাদের ওপর একটানা সাত রাত ও আট দিন চাপিয়ে দিলেন (সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৬-৭)। এই বাতাসের তীব্রতা ও হিমশীতলতা এতই প্রবল ছিল যে, বিশাল দেহের অধিকারী শক্তিশালী মানুষগুলোকে তা যেন আছাড় দিয়ে পিষে ফেলছিল।
কুরআনের চমৎকার শব্দচয়ন অনুযায়ী, ঝড়ের পর তাদের লাশের স্তূপ দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন ভেতর থেকে শূন্য বা উপড়ানো খেজুর গাছের ফাঁপা কাণ্ড। তাদের সুরম্য অট্টালিকা, পর্বত খোদাই করে বানানো প্রাসাদ এবং দুর্গগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেল। বাতাসের গর্জন ছিল বজ্রপাতের মতো ভয়াবহ।
কোনো কিছুই—না তাদের বিশাল দেহবল, না তাদের প্রকৌশলবিদ্যা—তাদের আল্লাহর লানত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ### হুদ (আ.) ও মুমিনদের মুক্তি পুরো জাতি যখন ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছিল, তখন মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ ওয়াদা অনুযায়ী হজরত হুদ (আ.) এবং তাঁর সাথে থাকা স্বল্পসংখ্যক মুমিনদের এক সুরক্ষিত স্থানে রক্ষা করেন। সূরা হুদ-এর ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, “যখন আমার নির্দেশ এল, তখন আমি হুদ ও তার সাথে ঈমানদারগণকে আমার বিশেষ রহমতে উদ্ধার করলাম এবং তাদের এক অতি কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক আজাব থেকে মুক্তি দিলাম।” তারা অক্ষত অবস্থায় মক্কায় হিজরত করেছিলেন বলে অনেক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
### শিক্ষা ও উপসংহার আদ জাতির এই করুণ পরিণতি কিয়ামত অবধি সমস্ত উদ্ধত জাতির জন্য এক জীবন্ত ও শিক্ষণীয় ইতিহাস। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে কীভাবে একটি সমৃদ্ধ জনপদ কেবল খোদাদ্রোহিতার কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে তাদের সেই অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ আল্লাহর ক্ষমতার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বা সামরিক শক্তি কখনোই সাফল্যের মূল মাপকাঠি হতে পারে না যদি তাতে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য না থাকে। যখন কোনো সমাজ আল্লাহর নিয়ামতকে নিজের কৃতিত্ব মনে করে দম্ভ প্রদর্শন করে ও তাওহীদ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তাদের ওপর আসমানি গজব অনিবার্য হয়ে পড়ে। হুদ (আ.)-এর সত্যবাদিতা আর সেই ধ্বংসাত্মক সাত দিনের বাতাস আজও মানবতাকে মনে করিয়ে দেয়—রাজত্ব কেবল আল্লাহর, আর বিনয়ই হলো প্রকৃত শক্তির মূল ভিত্তি।
নুহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের পরবর্তী সময়ে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে আগমন ঘটে ‘আদ’ সম্প্রদায়ের। তারা বর্তমান ইয়েমেন ও ওমানের মধ্যবর্তী ‘আল-আহক্বাফ’ নামক বালুময় ও পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করত। এই জাতিটি ছিল শারীরিক গঠনে অত্যন্ত দীর্ঘকায়, শক্তিশালী এবং তারা স্থাপত্যবিদ্যায় অভাবনীয় পারদর্শী ছিল।
ইতিহাসবিদ ও মুফাসসির ইবনে কাসীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, প্লাবনের পর আদ জাতিই প্রথম পৃথিবীতে পুনরায় মূর্তিপূজার সূচনা করে। তাদের এই বিচ্যুতি, সীমাহীন অহংকার এবং খোদাদ্রোহিতার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা তাদেরই বংশোদ্ভূত ও তাদের ভাই হজরত হুদ (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। ### আদ জাতির শক্তি ও দম্ভের বর্ণনা কুরআনুল কারিমের সূরা আল-আ’রাফে (৭:৬৯) বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের নুহ (আ.)-এর পরবর্তী উত্তরাধিকারী বানিয়েছিলেন এবং তাদের শারীরিক কাঠামোকে অন্য সাধারণ মানুষের তুলনায় বিশেষ উচ্চতা ও শক্তি প্রদান করেছিলেন।
তারা এই শক্তির মোহে অন্ধ হয়ে মহান আল্লাহর ইবাদত করার পরিবর্তে পার্থিব জৌলুসে মত্ত হয়ে পড়ে। তারা প্রতিটি উঁচু স্থানে উপহাসের ছলে আকাশচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণ করত এবং এমনভাবে দুর্গ ও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করত যেন তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে (সূরা আশ-শুয়ারা ২৬:১২৮-১২৯)। তাদের এই স্থাপত্যশৈলী কেবল প্রয়োজন মেটানোর জন্য ছিল না, বরং তা ছিল অহংকার ও দম্ভের বহিঃপ্রকাশ।
তাদের আত্মবিশ্বাস এতই প্রবল ছিল যে তারা সদম্ভে ঘোষণা করত, “আমাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী আর কে আছে?” (সূরা হা-মীম ৪১:১৫)। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় পাওয়া যায়, তারা এতই শক্তিশালী ছিল যে তারা খালি হাতে বড় বড় পাথর উপড়ে ফেলতে পারত। ### হুদ (আ.)-এর তাওহীদি দাওয়াত ও নাসিহা হজরত হুদ (আ.) অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তাঁর জাতিকে একত্ববাদের পথে আহ্বান করেন।
The Test
সূরা হুদ (১১:৫০) অনুসারে তিনি বলেন, ‘হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য নেই। তোমরা কি পরহেজগার হবে না?’ তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদের এই ধন-সম্পদ, উদ্যান, ঝরনাধারা, সন্তান-সন্ততি এবং পশুপাল—সবই আল্লাহর দান।
তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা তাদের বিগত পাপাচারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। হুদ (আ.) বলেছিলেন, ‘হে আমার কওম!
তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসো; তাহলে তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের বর্তমান শক্তির সাথে আরও অধিক শক্তি বৃদ্ধি করে দেবেন’ (সূরা হুদ ১১:৫২)। তিনি তাদের বুঝিয়েছিলেন যে, তিনি এই উপদেশের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক বা বিনিময় চান না, তার পুরস্কার কেবল আল্লাহর কাছে। ### সম্প্রদায়ের চরম প্রত্যাখ্যান ও অবাধ্যতা হুদ (আ.)-এর নরম ও যৌক্তিক দাওয়াতের বিপরীতে আদ জাতির নেতৃস্থানীয়রা তাঁকে চরম অবজ্ঞার সাথে প্রত্যাখ্যান করে।
তারা তাকে 'নির্বোধ' (সাফাহাত) এবং 'মিথ্যুক' বলে আখ্যায়িত করে (সূরা আল-আ'রাফ ৭:৬৬)। তারা বলতে লাগল, “তুমি তো আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসোনি। আমরা কেবল তোমার কথায় আমাদের পিতৃপুরুষদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব না” (সূরা হুদ ১১:৫৩)।
তারা আরও দাবি করল যে, হুদ (আ.) হয়তো তাদের কোনো দেবতার অভিশাপে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়েছেন বা মস্তিষ্কবিকৃত হয়েছেন। হুদ (আ.) আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা প্রকাশ করে তাদের চ্যালেঞ্জ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, তাঁর রিজিক এবং নিরাপত্তা কেবল তাঁর রবের হাতেই নিহিত। তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে বলেন, "আমি তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি।
আমার রব চাইলে তোমাদের পরিবর্তে অন্য কোনো জাতিকেও স স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন।" আদ জাতি তখন আল্লাহর আজাব নিয়ে বিদ্রুপ শুরু করে। তারা বলতে থাকে—যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে নিয়ে আসো সেই আজাব যার কথা তুমি বারবার বলছ। ### মেঘখণ্ড ও আজাবের সূচনা যখন আদ জাতির অবাধ্যতা সীমা অতিক্রম করল, তখন তাদের অঞ্চলে দীর্ঘ তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে গেল।
খরায় তাদের সব শস্য ও চারণভূমি শুষ্ক হয়ে পড়ল। এরপর হঠাৎ একদিন তারা দিগন্তে এক বিশাল মেঘখণ্ড ঘনিয়ে আসতে দেখল। সূরা আল-আহক্বাফে (৪৬:২৪) বর্ণিত হয়েছে যে, যখন আজাব ঘনিভূত হল, তারা ভেবেছিল এটি রহমতের বৃষ্টি।
The Lesson
তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বলতে লাগল, “এটি সেই মেঘ যা আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে।” কিন্তু হুদ (আ.) তাদের বিভ্রম দূর করে সতর্কবাণী দিলেন, “না, এটি তোমাদের ত্বরান্বিত করা সেই আজাব; এটি এমন এক প্রলয়ঙ্কারী বায়ু যাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” ### চূড়ান্ত শাস্তি: সাত রাত ও আট দিনের ধ্বংসলীলা অবশেষে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এক অবিশ্বাস্য গতিসম্পন্ন ও আর্তনাদকারী শীতল ঘূর্ণিবায়ু বা ‘সর-সর’ তাদের ওপর আছড়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা এই বায়ুকে তাদের ওপর একটানা সাত রাত ও আট দিন চাপিয়ে দিলেন (সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৬-৭)। এই বাতাসের তীব্রতা ও হিমশীতলতা এতই প্রবল ছিল যে, বিশাল দেহের অধিকারী শক্তিশালী মানুষগুলোকে তা যেন আছাড় দিয়ে পিষে ফেলছিল।
কুরআনের চমৎকার শব্দচয়ন অনুযায়ী, ঝড়ের পর তাদের লাশের স্তূপ দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন ভেতর থেকে শূন্য বা উপড়ানো খেজুর গাছের ফাঁপা কাণ্ড। তাদের সুরম্য অট্টালিকা, পর্বত খোদাই করে বানানো প্রাসাদ এবং দুর্গগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেল। বাতাসের গর্জন ছিল বজ্রপাতের মতো ভয়াবহ।
কোনো কিছুই—না তাদের বিশাল দেহবল, না তাদের প্রকৌশলবিদ্যা—তাদের আল্লাহর লানত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ### হুদ (আ.) ও মুমিনদের মুক্তি পুরো জাতি যখন ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছিল, তখন মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ ওয়াদা অনুযায়ী হজরত হুদ (আ.) এবং তাঁর সাথে থাকা স্বল্পসংখ্যক মুমিনদের এক সুরক্ষিত স্থানে রক্ষা করেন। সূরা হুদ-এর ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, “যখন আমার নির্দেশ এল, তখন আমি হুদ ও তার সাথে ঈমানদারগণকে আমার বিশেষ রহমতে উদ্ধার করলাম এবং তাদের এক অতি কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক আজাব থেকে মুক্তি দিলাম।” তারা অক্ষত অবস্থায় মক্কায় হিজরত করেছিলেন বলে অনেক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
### শিক্ষা ও উপসংহার আদ জাতির এই করুণ পরিণতি কিয়ামত অবধি সমস্ত উদ্ধত জাতির জন্য এক জীবন্ত ও শিক্ষণীয় ইতিহাস। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে কীভাবে একটি সমৃদ্ধ জনপদ কেবল খোদাদ্রোহিতার কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে তাদের সেই অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ আল্লাহর ক্ষমতার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বা সামরিক শক্তি কখনোই সাফল্যের মূল মাপকাঠি হতে পারে না যদি তাতে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য না থাকে। যখন কোনো সমাজ আল্লাহর নিয়ামতকে নিজের কৃতিত্ব মনে করে দম্ভ প্রদর্শন করে ও তাওহীদ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তাদের ওপর আসমানি গজব অনিবার্য হয়ে পড়ে। হুদ (আ.)-এর সত্যবাদিতা আর সেই ধ্বংসাত্মক সাত দিনের বাতাস আজও মানবতাকে মনে করিয়ে দেয়—রাজত্ব কেবল আল্লাহর, আর বিনয়ই হলো প্রকৃত শক্তির মূল ভিত্তি।