Islamic Story
হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি: প্রথম মানুষ ও জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমনের ইতিহাস
Can Prophet Adam change your heart today? Discover repentance, obedience, and Allah’s mercy in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens faith.
গল্পের শিক্ষা
এই কাহিনীর মূল শিক্ষা হলো অহংকার বর্জন করা এবং গুনাহ হয়ে গেলে কালক্ষেপণ না করে আল্লাহর কাছে তওবা করা। শয়তান তার ভুলের ওপর অনড় ছিল বলে অভিশপ্ত হয়েছে, আর আদম (আঃ) ক্ষমা চেয়েছিলেন বলে আল্লাহর বন্ধু ও নবী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।
Beginning
সৃষ্টিজগত সৃষ্টির এক নিগূঢ় রহস্য ও মহান উদ্দেশ্য নিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা প্রথম মানব আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আল-বাকারাহ (২:৩০) অনুযায়ী, আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের সামনে তাঁর এই পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করলেন যে, ‘আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি,’ তখন ফেরেশতারা বিনম্রভাবে এর উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। তারা নিবেদন করলেন যে, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রক্তপাত ঘটাবে?
অথচ আমরাই আপনার প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করছি।’ আল্লাহ তাঁদের উত্তরে এক অটল ও গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।’ হাফিজ ইবনে কাসীর এবং সহীহ হাদীসের প্রামাণ্য বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ জিবরাঈল (আঃ) ও অন্যান্য ফেরেশতাদের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মাটি সংগ্রহ করে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। এই মাটিতে বিভিন্ন বর্ণ ও প্রকৃতির মিশ্রণ ছিল বলেই আদম-সন্তানদের কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ নরম মেজাজের আবার কেউ রূঢ় স্বভাবের হয়ে থাকে। তাঁর সুঠাম দেহ আকৃতি দেওয়ার পর আল্লাহ দীর্ঘকাল তাঁকে সেই অবস্থায় রেখে দেন।
অতঃপর আল্লাহ তাতে তাঁর পক্ষ থেকে রূহ বা আত্মা ফুঁকে দিলেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা মতে, আদম (আঃ) যখন প্রাণ ফিরে পেলেন এবং প্রথম হাঁচি দিলেন, তখন ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা শেখানো হলো, যার উত্তরে আল্লাহ বললেন ‘ইয়ারহামুকা রাব্বুক’ (তোমার প্রতি তোমার রবের রহমত বর্ষিত হোক)। এরপর আল্লাহ আদমকে এক বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব দান করলেন, যা ছিল ‘ইলম’ বা জ্ঞান।
সূরা আল-বাকারাহর ৩১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, আল্লাহ আদমকে প্রতিটি জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন। এই জ্ঞান ছিল এক বিশেষ ঐশী দান যা ফেরেশতাদের দেওয়া হয়নি। এরপর আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে সেই বস্তুসমূহ পেশ করে সেগুলোর নাম জিজ্ঞেস করলেন।
ফেরেশতারা তাঁদের অক্ষমতা স্বীকার করে বিনীতভাবে বললেন, ‘হে পবিত্র সত্তা!
The Test
আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।’ এরপর আদম (আঃ) যখন আল্লাহর নির্দেশে সবকিছুর নাম অবলীলায় বলে দিলেন, তখন ফেরেশতাদের কাছে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও খেলাফতের যোগ্যতা প্রমাণিত হলো। আল্লাহ তখন বললেন, 'আমি কি তোমাদের বলিনি যে আমি আসমান ও যমীনের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত?' এই স্বীকৃতির পর আল্লাহ ফেরেশতাদের এবং সেখানে জিন জাতি থেকে উপস্থিত ইবলিসকে নির্দেশ দিলেন আদমকে সিজদা করার জন্য। এটি ইবাদতের সিজদা ছিল না, বরং ছিল আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্য এবং আদমের প্রতি সম্মানের নিদর্শন (তাহিয়্যাহ)।
সূরা আল-আরাফ (৭:১১) অনুযায়ী, ফেরেশতারা সবাই নির্দ্বিধায় সিজদা করলেও ইবলিস অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করল। সূরা আল-আরাফ (৭:১২) অনুযায়ী, আল্লাহ যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন কিসে তাকে সিজদা করতে বাধা দিল, সে যুক্তি দেখাল যে সে আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি, তাই সে শ্রেষ্ঠ। এই বর্ণবাদী অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণে আল্লাহ তাকে জান্নাত ও রহমত থেকে চিরতরে বহিষ্কার করলেন এবং সে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হলো।
অতঃপর আল্লাহ আদম (আঃ)-কে জান্নাতে বসবাসের অনুমতি দিলেন। তাঁর একাকীত্ব দূর করার জন্য আল্লাহ তাঁর ঘুমের ঘোরে বাম পাঁজরের হাড় থেকে বিবি হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে সৃষ্টি করলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা অনুসারে, নারীদের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টির এই তথ্যটি তাদের প্রতি কোমল আচরণের শিক্ষা দেয়।
তাঁদের জান্নাতে অবাধ ভ্রমণের অনুমতি দিয়ে বলা হলো, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেখান থেকে ইচ্ছা আহার করো, তবে এই নির্দিষ্ট গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না; তাহলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (সূরা বাকারা ২:৩৫)। কিন্তু জান্নাত থেকে বিতাড়িত ইবলিস দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না।
সে আদম ও হাওয়ার মনে কুমন্ত্রণা বা ‘ওয়াসওয়াসা’ দিতে শুরু করল। সূরা ত্ব-হা (২০:১২০) এবং সূরা আল-আরাফের বর্ণনা অনুযায়ী, ইবলিস তাঁদের কাছে ছদ্মবেশী হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলল যে, আল্লাহ তাঁদের এই গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছেন কেবল এই কারণে যে এটি খেলে তাঁরা চিরঞ্জীব হয়ে যাবেন অথবা ফেরেশতায় রূপান্তরিত হয়ে যাবেন। শয়তান প্রলোভন দেখালো যে এটি হলো 'খুলদ' বা চিরস্থায়ী জীবন লাভের বৃক্ষ।
শয়তানের নিরন্তর প্ররোচনা এবং মিথ্যে শপথের ফাঁদে পড়ে মানুষ হিসেবে তাঁরা বিভ্রান্ত হলেন এবং এক পর্যায়ে সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল আস্বাদন করলেন। ফল ভক্ষণ করার সাথে সাথেই এক অলৌকিক পরিবর্তন ঘটলো। তাঁদের পবিত্র জান্নাতি পোশাক শরীর থেকে খসে পড়ল এবং তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত দেখে অত্যন্ত লজ্জিত ও সংকুচিত হলেন।
তাঁরা দ্রুত জান্নাতের গাছের পাতাগুলো জোড়া দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে শুরু করলেন। তখন আল্লাহ তাঁদের মহিমায় ডাক দিয়ে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের এই গাছ থেকে নিষেধ করিনি? আমি কি বলিনি যে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?’ (সূরা আল-আরাফ ৭:২২)। সে মুহূর্তেই আদম (আঃ) তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। এটি কোনো জেদ বা পরিকল্পিত অবাধ্যতা ছিল না, বরং ছিল সাময়িক বিস্মৃতি ও শয়তানের চাতুর্যপূর্ণ ধোঁকা।
The Lesson
সূরা ত্ব-হা (২০:১১৫) এ আল্লাহ স্বয়ং ঘোষণা করেন, ‘আমি ইতিপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল; আমি তার মধ্যে সংকল্পের দৃঢ়তা পাইনি।’ আদম ও হাওয়া (আঃ) শয়তানের মতো উদ্ধত না হয়ে তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ইবনে কাসীরের বর্ণনা মতে, আদম (আঃ) অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলতে পারতেন না। তাঁরা যে মর্মস্পর্শী দোয়ার মাধ্যমে তওবা করেছিলেন তা আল্লাহ নিজেই তাঁদের করুণা করে শিখিয়ে দিয়েছিলেন: ‘রাব্বানা জালামনা আনফুসানা’ অর্থাৎ, ‘হে আমাদের পালনকর্তা!
আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব’ (সূরা আল-আরাফ ৭:২৩)। আল্লাহ তায়ালা মহাক্ষমাশীল (আত-তাওয়াব) ও পরম দয়ালু (আর-রাহীম)।
তিনি তাঁদের আন্তরিক তওবা কবুল করে নিলেন। তবে তাঁর পূর্বপরিকল্পনা ও জগতের হিকমত অনুযায়ী আদম, হাওয়া এবং ইবলিসকে মহাবিশ্বের নতুন মঞ্চ—পৃথিবীতে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে, পৃথিবী হবে মানুষের জন্য এক নির্দিষ্ট সময়ের আবাসস্থল এবং সেখানে আদম সন্তানের সাথে শয়তানের বাহিনীর এক নিরন্তর পরীক্ষা ও বিরোধ থাকবে।
সূরা আল-বাকারাহর ৩৮-৩৯ আয়াতে আল্লাহ পৃথিবীর জীবনের জন্য এক মূলনীতি ঘোষণা করলেন যে, মানুষের কাছে যখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত বা সঠিক পথের নির্দেশ আসবে, যারা সেই নির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের পরকালে কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। আদম (আঃ) পৃথিবীতে আগমনের পর মহান আল্লাহর প্রথম নবী হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তিনি তাঁর সন্তানদের আল্লাহর একত্ববাদ ও আনুগত্যের শিক্ষা দিতেন।
ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুসারে, আদম (আঃ) প্রায় এক হাজার বছর জীবিত ছিলেন। তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ সময় তিনি পৃথিবীতে মানব বসতি গড়ে তোলা এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই ঐশী কাহিনী থেকে মুমিনদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো যে, মানুষ ভুল করতে পারে কিন্তু শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যে সরাসরি ভুলের পর আল্লাহর দিকে তওবা করে ফিরে আসে।
জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমন কোনো হীন শাস্তি ছিল না, বরং এটি ছিল এক মহৎ পরীক্ষার সূচনা। আল্লাহর অসীম রহমত এই যে, তিনি তওবাকারীকে অত্যন্ত ভালোবাসেন এবং আদমের সন্তানদের জন্য জান্নাতের পুনর্মিলনী নিশ্চিত রেখেছেন যদি তারা সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে অটল থাকতে পারে। এই কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে আল্লাহর সেই আশ্বাসের মাধ্যমে যে, দুনিয়া এক সাময়িক সফরনামা মাত্র, যেখানে সফলরাই হবে জান্নাতের চিরস্থায়ী বাসিন্দা।
সৃষ্টিজগত সৃষ্টির এক নিগূঢ় রহস্য ও মহান উদ্দেশ্য নিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা প্রথম মানব আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আল-বাকারাহ (২:৩০) অনুযায়ী, আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের সামনে তাঁর এই পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করলেন যে, ‘আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি,’ তখন ফেরেশতারা বিনম্রভাবে এর উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। তারা নিবেদন করলেন যে, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রক্তপাত ঘটাবে?
অথচ আমরাই আপনার প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করছি।’ আল্লাহ তাঁদের উত্তরে এক অটল ও গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।’ হাফিজ ইবনে কাসীর এবং সহীহ হাদীসের প্রামাণ্য বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ জিবরাঈল (আঃ) ও অন্যান্য ফেরেশতাদের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মাটি সংগ্রহ করে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। এই মাটিতে বিভিন্ন বর্ণ ও প্রকৃতির মিশ্রণ ছিল বলেই আদম-সন্তানদের কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ নরম মেজাজের আবার কেউ রূঢ় স্বভাবের হয়ে থাকে। তাঁর সুঠাম দেহ আকৃতি দেওয়ার পর আল্লাহ দীর্ঘকাল তাঁকে সেই অবস্থায় রেখে দেন।
অতঃপর আল্লাহ তাতে তাঁর পক্ষ থেকে রূহ বা আত্মা ফুঁকে দিলেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা মতে, আদম (আঃ) যখন প্রাণ ফিরে পেলেন এবং প্রথম হাঁচি দিলেন, তখন ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা শেখানো হলো, যার উত্তরে আল্লাহ বললেন ‘ইয়ারহামুকা রাব্বুক’ (তোমার প্রতি তোমার রবের রহমত বর্ষিত হোক)। এরপর আল্লাহ আদমকে এক বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব দান করলেন, যা ছিল ‘ইলম’ বা জ্ঞান।
সূরা আল-বাকারাহর ৩১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, আল্লাহ আদমকে প্রতিটি জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন। এই জ্ঞান ছিল এক বিশেষ ঐশী দান যা ফেরেশতাদের দেওয়া হয়নি। এরপর আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে সেই বস্তুসমূহ পেশ করে সেগুলোর নাম জিজ্ঞেস করলেন।
ফেরেশতারা তাঁদের অক্ষমতা স্বীকার করে বিনীতভাবে বললেন, ‘হে পবিত্র সত্তা!
The Test
আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।’ এরপর আদম (আঃ) যখন আল্লাহর নির্দেশে সবকিছুর নাম অবলীলায় বলে দিলেন, তখন ফেরেশতাদের কাছে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও খেলাফতের যোগ্যতা প্রমাণিত হলো। আল্লাহ তখন বললেন, 'আমি কি তোমাদের বলিনি যে আমি আসমান ও যমীনের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত?' এই স্বীকৃতির পর আল্লাহ ফেরেশতাদের এবং সেখানে জিন জাতি থেকে উপস্থিত ইবলিসকে নির্দেশ দিলেন আদমকে সিজদা করার জন্য। এটি ইবাদতের সিজদা ছিল না, বরং ছিল আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্য এবং আদমের প্রতি সম্মানের নিদর্শন (তাহিয়্যাহ)।
সূরা আল-আরাফ (৭:১১) অনুযায়ী, ফেরেশতারা সবাই নির্দ্বিধায় সিজদা করলেও ইবলিস অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করল। সূরা আল-আরাফ (৭:১২) অনুযায়ী, আল্লাহ যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন কিসে তাকে সিজদা করতে বাধা দিল, সে যুক্তি দেখাল যে সে আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি, তাই সে শ্রেষ্ঠ। এই বর্ণবাদী অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণে আল্লাহ তাকে জান্নাত ও রহমত থেকে চিরতরে বহিষ্কার করলেন এবং সে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হলো।
অতঃপর আল্লাহ আদম (আঃ)-কে জান্নাতে বসবাসের অনুমতি দিলেন। তাঁর একাকীত্ব দূর করার জন্য আল্লাহ তাঁর ঘুমের ঘোরে বাম পাঁজরের হাড় থেকে বিবি হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে সৃষ্টি করলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা অনুসারে, নারীদের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টির এই তথ্যটি তাদের প্রতি কোমল আচরণের শিক্ষা দেয়।
তাঁদের জান্নাতে অবাধ ভ্রমণের অনুমতি দিয়ে বলা হলো, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেখান থেকে ইচ্ছা আহার করো, তবে এই নির্দিষ্ট গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না; তাহলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (সূরা বাকারা ২:৩৫)। কিন্তু জান্নাত থেকে বিতাড়িত ইবলিস দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না।
সে আদম ও হাওয়ার মনে কুমন্ত্রণা বা ‘ওয়াসওয়াসা’ দিতে শুরু করল। সূরা ত্ব-হা (২০:১২০) এবং সূরা আল-আরাফের বর্ণনা অনুযায়ী, ইবলিস তাঁদের কাছে ছদ্মবেশী হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলল যে, আল্লাহ তাঁদের এই গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছেন কেবল এই কারণে যে এটি খেলে তাঁরা চিরঞ্জীব হয়ে যাবেন অথবা ফেরেশতায় রূপান্তরিত হয়ে যাবেন। শয়তান প্রলোভন দেখালো যে এটি হলো 'খুলদ' বা চিরস্থায়ী জীবন লাভের বৃক্ষ।
শয়তানের নিরন্তর প্ররোচনা এবং মিথ্যে শপথের ফাঁদে পড়ে মানুষ হিসেবে তাঁরা বিভ্রান্ত হলেন এবং এক পর্যায়ে সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল আস্বাদন করলেন। ফল ভক্ষণ করার সাথে সাথেই এক অলৌকিক পরিবর্তন ঘটলো। তাঁদের পবিত্র জান্নাতি পোশাক শরীর থেকে খসে পড়ল এবং তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থান উন্মুক্ত দেখে অত্যন্ত লজ্জিত ও সংকুচিত হলেন।
তাঁরা দ্রুত জান্নাতের গাছের পাতাগুলো জোড়া দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে শুরু করলেন। তখন আল্লাহ তাঁদের মহিমায় ডাক দিয়ে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের এই গাছ থেকে নিষেধ করিনি? আমি কি বলিনি যে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?’ (সূরা আল-আরাফ ৭:২২)। সে মুহূর্তেই আদম (আঃ) তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। এটি কোনো জেদ বা পরিকল্পিত অবাধ্যতা ছিল না, বরং ছিল সাময়িক বিস্মৃতি ও শয়তানের চাতুর্যপূর্ণ ধোঁকা।
The Lesson
সূরা ত্ব-হা (২০:১১৫) এ আল্লাহ স্বয়ং ঘোষণা করেন, ‘আমি ইতিপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল; আমি তার মধ্যে সংকল্পের দৃঢ়তা পাইনি।’ আদম ও হাওয়া (আঃ) শয়তানের মতো উদ্ধত না হয়ে তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ইবনে কাসীরের বর্ণনা মতে, আদম (আঃ) অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলতে পারতেন না। তাঁরা যে মর্মস্পর্শী দোয়ার মাধ্যমে তওবা করেছিলেন তা আল্লাহ নিজেই তাঁদের করুণা করে শিখিয়ে দিয়েছিলেন: ‘রাব্বানা জালামনা আনফুসানা’ অর্থাৎ, ‘হে আমাদের পালনকর্তা!
আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব’ (সূরা আল-আরাফ ৭:২৩)। আল্লাহ তায়ালা মহাক্ষমাশীল (আত-তাওয়াব) ও পরম দয়ালু (আর-রাহীম)।
তিনি তাঁদের আন্তরিক তওবা কবুল করে নিলেন। তবে তাঁর পূর্বপরিকল্পনা ও জগতের হিকমত অনুযায়ী আদম, হাওয়া এবং ইবলিসকে মহাবিশ্বের নতুন মঞ্চ—পৃথিবীতে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে, পৃথিবী হবে মানুষের জন্য এক নির্দিষ্ট সময়ের আবাসস্থল এবং সেখানে আদম সন্তানের সাথে শয়তানের বাহিনীর এক নিরন্তর পরীক্ষা ও বিরোধ থাকবে।
সূরা আল-বাকারাহর ৩৮-৩৯ আয়াতে আল্লাহ পৃথিবীর জীবনের জন্য এক মূলনীতি ঘোষণা করলেন যে, মানুষের কাছে যখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত বা সঠিক পথের নির্দেশ আসবে, যারা সেই নির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের পরকালে কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। আদম (আঃ) পৃথিবীতে আগমনের পর মহান আল্লাহর প্রথম নবী হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তিনি তাঁর সন্তানদের আল্লাহর একত্ববাদ ও আনুগত্যের শিক্ষা দিতেন।
ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুসারে, আদম (আঃ) প্রায় এক হাজার বছর জীবিত ছিলেন। তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ সময় তিনি পৃথিবীতে মানব বসতি গড়ে তোলা এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই ঐশী কাহিনী থেকে মুমিনদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো যে, মানুষ ভুল করতে পারে কিন্তু শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যে সরাসরি ভুলের পর আল্লাহর দিকে তওবা করে ফিরে আসে।
জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমন কোনো হীন শাস্তি ছিল না, বরং এটি ছিল এক মহৎ পরীক্ষার সূচনা। আল্লাহর অসীম রহমত এই যে, তিনি তওবাকারীকে অত্যন্ত ভালোবাসেন এবং আদমের সন্তানদের জন্য জান্নাতের পুনর্মিলনী নিশ্চিত রেখেছেন যদি তারা সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে অটল থাকতে পারে। এই কাহিনীর সমাপ্তি ঘটে আল্লাহর সেই আশ্বাসের মাধ্যমে যে, দুনিয়া এক সাময়িক সফরনামা মাত্র, যেখানে সফলরাই হবে জান্নাতের চিরস্থায়ী বাসিন্দা।