Islamic Story

আসহাবে উখদুদ বা গর্তওয়ালা: আগুনের কুণ্ডলীতেও ঈমান না হারানোর ঐতিহাসিক কাহিনী

Can The People of the Ditch change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens.

আসহাবে উখদুদ বা গর্তওয়ালা: আগুনের কুণ্ডলীতেও ঈমান না হারানোর ঐতিহাসিক কাহিনী

গল্পের শিক্ষা

সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ে চূড়ান্ত বিজয় সর্বদা সত্যেরই হয়, এমনকি বাহ্যিকভাবে সত্যপন্থীরা নির্যাতিত হলেও তাদের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে হকের নূর প্রজ্জ্বলিত হয়। একজন মুমিনের জীবনের চেয়ে তার ঈমানের মূল্য অনেক বেশি, এবং আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কেউ কারো ক্ষতি করতে পারে না।

Beginning

ইসলামের ইতিহাসে ঈমানী দৃঢ়তা ও একত্ববাদের প্রসারে আসহাবে উকদুদ বা খন্দকবাসীদের কাহিনী এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সহীহ মুসলিমের ৩০০৫ নম্বর হাদীস এবং তাফসীরে ইবনে কাসীরে সূরা আল-বুরুজের ৪-১০ নম্বর আয়াতের প্রেক্ষাপটে এই কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। প্রাচীনকালে এক প্রতাপশালী রাজা ছিলেন, যিনি নিজেকে খোদা বলে দাবি করতেন।

তার রাজদরবারে একজন বৃদ্ধ জাদুকর ছিল। যখন জাদুকর বুঝতে পারল যে তার মৃত্যু নিকটবর্তী, তখন সে রাজার কাছে একজন মেধাবী কিশোরকে চাইল যাকে সে তার জাদুর সব কলাকৌশল শিখিয়ে যেতে পারে। রাজার নির্দেশে এক কিশোরকে জাদুকরের কাছে তালিমের জন্য পাঠানো হলো।

কিশোরটি প্রতিদিন জাদুকরের কাছে যাওয়ার পথে এক পাহাড়ের গুহায় নির্জনবাসী এক রাহিব বা দরবেশের দেখা পেল। কৌতূহলবশত সে দরবেশের কাছে বসে তার কথা শুনল এবং বুঝতে পারল যে জাদুকরের শিক্ষার চেয়ে দরবেশের তাওহীদের শিক্ষা অনেক বেশি সত্য ও যৌক্তিক। কিশোরটি নিয়মিত দরবেশের মজলিসে বসতে শুরু করল।

এর ফলে জাদুকরের কাছে পৌঁছাতে তার দেরি হতো এবং জাদুকর তাকে মারধর করত। আবার বাড়ি ফিরতেও দেরি হওয়ায় পরিবারের কাছেও তাকে জবাবদিহি করতে হতো। কিশোরটি এই সমস্যার কথা দরবেশকে জানালে তিনি তাকে একটি উপায় শিখিয়ে দিলেন।

তিনি বললেন, জাদুকর যখন দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইবে, তখন বলবে যে বাড়ির লোক আটকে রেখেছিল, আর পরিবার যখন জিজ্ঞাসা করবে, তখন বলবে জাদুকর আটকে রেখেছিল। এভাবে কিশোরটি জাদুর আড়ালে ইসলামের মূল শিক্ষা গ্রহণ করতে লাগল। একদিন কিশোর দেখল যে জনপথে এক বিশাল হিংস্র প্রাণী মানুষের পথ আগলে বসে আছে এবং মানুষ ভয়ে চলাচল করতে পারছে না।

কিশোর ভাবল, আজই পরীক্ষা করার উপযুক্ত সময় যে কার পথ আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়—জাদুকরের না দরবেশের। সে একটি পাথর হাতে নিয়ে বলল, হে আল্লাহ! যদি দরবেশের দেখানো পথ জাদুকরের পথের চেয়ে আপনার কাছে অধিক প্রিয় হয়, তবে এই পাথর দিয়ে প্রাণীটিকে হত্যা করে মানুষের পথ সুগম করে দিন।

The Test

এই বলে সে পাথরটি নিক্ষেপ করলে প্রাণীটি মারা যায় এবং মানুষ চলাচলের পথ ফিরে পায়। এই ঘটনার পর কিশোরটি দরবেশের কাছে গেলে তিনি বললেন, হে বৎস! আজ থেকে তুমি আমার চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় আসীন হলে। অচিরেই তোমার ওপর কঠিন পরীক্ষা আসবে। যদি তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হও, তবে আমার নাম প্রকাশ করো না।

আল্লাহ তায়ালা সেই কিশোরকে অলৌকিক ক্ষমতা দান করলেন। সে জন্মন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীদের আরোগ্য করতে শুরু করল। তবে সে স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে সে কাউকে সুস্থ করে না, বরং আল্লাহই সুস্থ করেন; সুস্থতা পেতে হলে আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে হবে।

রাজার এক অন্ধ পারিষদ এই খবর শুনে কিশোরের কাছে আরোগ্য কামনায় এল। কিশোর তাকে বলল, আমি কাউকে সুস্থ করতে পারি না। আপনি যদি আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন তবে আমি আপনার জন্য দোয়া করব।

পারিষদ ঈমান আনলেন এবং আল্লাহর কুদরতে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন। পরদিন সেই পারিষদ দরবারে গেলে রাজা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া দেখে বিস্মিত হন। রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল?

পারিষদ উত্তর দিলেন, আমার পালনকর্তা আল্লাহ। রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, আমি ছাড়া তোমার অন্য কোনো রব আছে কি?

পারিষদ দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, আল্লাহ আমার এবং আপনার উভয়ের রব। রাজা তখন পারিষদকে অমানুষিক নির্যাতন করতে শুরু করলেন যতক্ষণ না তিনি কিশোরের হদিস দিলেন। কিশোরকে আনা হলে তাকেও নির্যাতন করা হলো এবং শেষ পর্যন্ত দরবেশের সন্ধান পাওয়া গেল।

রাজপ্রাসাদে দরবেশকে এনে তার মস্তক করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হলো, তবু তিনি ঈমান ত্যাগ করলেন না। একইভাবে সেই পারিষদকেও শহীদ করা হলো। রাজা কিশোরকে তার ধর্ম ত্যাগ করার আদেশ দিলেন, কিন্তু সে অটল থাকল।
তখন রাজা তার কয়েকজন সিপাহীকে আদেশ দিলেন একে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাও, যদি সে ধর্ম ত্যাগ না করে তবে তাকে নিচে ফেলে দাও। পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাওয়ার পর কিশোর দোয়া করল, হে আল্লাহ! আপনি যেভাবে খুশি আমাকে রক্ষা করুন।

The Lesson

তৎক্ষণাৎ পাহাড় কেঁপে উঠল এবং সৈন্যরা পড়ে গিয়ে মারা গেল আর কিশোর অক্ষত অবস্থায় হেঁটে রাজার কাছে ফিরে এল। বিস্ময়াবিষ্ট রাজা পুনরায় তাকে নৌকাযোগে সমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে ডুবিয়ে মারার আদেশ দিলেন। সেখানেও কিশোর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইল এবং প্রচণ্ড ঝড়ে নৌকা ডুবে সিপাহীরা মারা গেল, কিন্তু কিশোর আবারো অলৌকিকভবে রক্ষা পেয়ে ফিরে এল।

কিশোরটি রাজাকে বলল, আপনি আমাকে কখনোই হত্যা করতে পারবেন না, যতক্ষণ না আমার শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে আমাকে মারার চেষ্টা করবেন। রাজা ব্যাকুল হয়ে সেই পদ্ধতি জানতে চাইলেন। কিশোর বলল, আপনি দেশের সমস্ত মানুষকে বিশাল এক ময়দানে একত্রিত করুন এবং একটি খুঁটির সাথে আমাকে বেঁধে রাখুন।

এরপর আমার তূনীর থেকে একটি তীর নিয়ে ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম’ অর্থাৎ এই কিশোরের রবের নামে—বলে নিক্ষেপ করুন। রাজা তাই করলেন। হাজার হাজার মানুষের সামনে রাজা কিশোরের রবের নাম নিয়ে তীর নিক্ষেপ করলেন।

তীরটি কিশোরের কপালে বিদ্ধ হলো এবং সে মৃত্যুবরণ করল। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল, আমরা এই কিশোরের রবের ওপর ঈমান আনলাম। রাজা যা ভয় পাচ্ছিলেন ঠিক তাই হলো।

ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা শহরের প্রবেশপথে বড় বড় গর্ত বা খন্দক খুঁড়লেন এবং সেখানে আগুন জ্বালানোর আদেশ দিলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, যারা এই কিশোরের রবে ঈমান এনেছে তাদের প্রত্যেককে জীবন্ত এই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে। ঈমানদাররা পেছপা হলেন না।

একে একে সবাইকে আগুনের গর্তে ফেলা হতে লাগল। সেখানে এক নারী তার কোলে ছোট শিশু নিয়ে কিছুটা ইতস্তত করছিলেন, তখন সেই দুধের শিশু অলৌকিকভাবে কথা বলে উঠল, হে মা!

তুমি ধৈর্য ধরো, নিশ্চয়ই তুমি হকের ওপর আছো। এই ঘটনাটিই সূরা আল-বুরুজে ‘আসহাবে উকদুদ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ইহলৌকিক বিচারে তারা শহীদ হয়েছিলেন, কিন্তু মহান আল্লাহর দরবারে তারা চূড়ান্ত সফলতা লাভ করেছিলেন।