Islamic Story
মুসআব ইবনে উমাইর (রা.): ইসলামের প্রথম দূত ও মদিনায় হিদায়াতের আলোকবর্তিকা
Can The First Envoy change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens faith.
গল্পের শিক্ষা
মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-এর জীবন থেকে প্রধান শিক্ষা হলো দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসিতার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ঈমান অনেক বেশি মূল্যবান। ইসলামের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করার মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে গেছেন যে, বিনয়ী ও ধৈর্যশীল দাওয়াতী কাজের মাধ্যমেই মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব এবং শাহাদাতের অমরত্ব দুনিয়ার সব রাজকীয় ঐশ্বর্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
Beginning
ইসলামের ইতিহাসে মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-এর জীবন এক বিস্ময়কর ত্যাগের উপাখ্যান এবং আদর্শিক দৃঢ়তার নাম। মক্কার বনু আবদ আদ-দার বংশের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। মক্কার তরুণদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুশ্রী, মার্জিত এবং সুগন্ধি ব্যবহারের জন্য সুপরিচিত।
তাঁর পোশাক ও রাজকীয় বিলাসিতা ছিল সেকালের মক্কাবাসীদের আলোচনার প্রধান বিষয়। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ (৩য় খণ্ড) অনুযায়ী, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন যে, তিনি মক্কায় মুসআব অপেক্ষা আর কাউকে এত সুন্দর ও নেয়ামতপূর্ণ জীবনযাপন করতে দেখেননি। তবে এই দুনিয়াবী চাকচিক্য তাঁকে সত্যের পরম সন্ধান থেকে বিমুখ করতে পারেনি।
নবুয়তের প্রারম্ভিক যুগে যখন তাওহীদের দাওয়াত শুরু হলো, মুসআব (রা.) লোকচক্ষুর অন্তরালে দারুল আরকামে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত কোরআনের স্বর্গীয় বাণী শ্রবণ করেন এবং কালক্ষেপণ না করে ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসআবের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সংবাদ যখন তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছাল, বিশেষ করে তাঁর মা খুন্নাস বিনতে মালিক যখন এটি জানতে পারলেন, তখন শুরু হলো এক অসহনীয় নির্যাতনের অধ্যায়। তাঁর মা তাঁকে বন্দী করে রাখেন এবং এক পর্যায়ে তাঁর সমস্ত সম্পদ ও রাজকীয় পোশাক কেড়ে নেন।
The Test
এক সময়ের বিখ্যাত 'রাজপুত্র', যাঁর দেহ দামী রেশমি বসনে আবৃত থাকতো, ইসলামের খাতিরে তাঁকে তালি দেওয়া চট বা সাধারণ তন্তু দিয়ে নির্মিত খসখসে পোশাক পরিধান করতে হলো। কুরাইশদের এই ক্রমাগত ও অমানবিক নির্যাতনের মুখে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে তিনি প্রথম হিজরতে শরিক হয়ে সুদূর আবিসিনিয়ায় (হাবশায়) গমন করেন। সেখানে তিনি অভাব আর অনটনকে সাথী করে দিনাতিপাত করলেও ঈমানের নূরে তাঁর হৃদয় ছিল আলোকিত।
আবিসিনিয়া থেকে ফিরে আসার পর ইসলামের প্রসারে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা এক নতুন মাত্রা লাভ করে। প্রথম আকাবার শপথের পর মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) আনসাররা যখন নবীজির কাছে একজন ধর্মীয় শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার কথা জানালেন, তখন বিশ্বনবী (সা.) মুসআব ইবনে উমায়েরকে (রা.) মদিনার প্রথম 'রাষ্ট্রদূত' হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে নন, বরং মদিনাবাসীদের কাছে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও তাওহীদের বানী পৌঁছে দেওয়ার মহান লক্ষ্য নিয়ে সেই জনপদে পদার্পণ করেন।
মদিনায় তাঁর দাওয়াতী কৌশল ছিল আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর ও হিকমতপূর্ণ। তিনি প্রবীণ আনসার সাহাবী আস'আদ ইবনে জুরারাহ (রা.)-এর আতিথেয়তায় মেহমান হিসেবে থেকে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে প্রতিটি ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন। একদা মদিনার চরম ক্ষুব্ধ গোত্রপতি সা'দ ইবনে মুআদ এবং উসাইদ ইবনে হুদাইর যখন তলোয়ার হাতে তাঁকে বাধা দিতে আসলেন, মুসআব (রা.) বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে অত্যন্ত শান্ত স্বরে তাঁদের বললেন, 'যদি আপনারা অনুগ্রহ করে একটু বসেন এবং কথাগুলো শোনেন, যদি ভালো লাগে তবে গ্রহণ করবেন, আর যদি ভালো না লাগে তবে আমরা আপনাদের অপছন্দীয় কাজ থেকে ফিরে যাব এবং চলে আসব।' তাঁর এই সুশৃঙ্খল যুক্তি এবং সুললিত কণ্ঠে কোরআনের তেলাওয়াত শুনে তাঁদের রুদ্ধ হৃদয় খুলে যায় এবং সেখানেই তাঁরা ইসলাম কবুল করেন।
তাঁদের এই পরিবর্তনের প্রভাবে মদিনার বনু আব্দুল আশহাল গোত্রের প্রায় সকলেই ইসলামে দাখিল হয়। ফলস্বরূপ, মদিনার প্রতিটি অন্দরে ইসলামের বানী পৌঁছে যায় অতি অল্প সময়ে। দ্বিতীয় আকাবার শপথের সময় মুসআব (রা.) মদিনার পঁচাত্তর জন ঈমানদারের এক শক্তিশালী প্রতিনিধি দল নিয়ে মক্কায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তাঁর এই অবিস্মরণীয় সফলতার বিবরণ পেশ করেন, যা মূলত মদিনায় হিজরতের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
The Lesson
মদিনায় হিজরতের পরবর্তী সময়ে যখন ইসলামের সপক্ষে যুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষা শুরু হলো, মুসআব (রা.) সেখানেও নির্ভিক সিপাহসালারের পরিচয় দেন। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে তিনি মুহাজিরদের প্রধান পতাকাবাহী (আল-লিওয়া) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মাত্র এক বছর পর ওহুদের রণাঙ্গনেও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাতেই ইসলামের পবিত্র প্রধান ঝাণ্ডা তুলে দেন।
ওহুদের যুদ্ধের এক সন্ধিক্ষণে যখন মুসলিম বাহিনীর একাংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং মুশরিক বাহিনী পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালায়, তখন মুসআব (রা.) অটল পাহাড়ের মতো বীরত্বের সাথে ইসলামের নিশান আঁকড়ে ধরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রক্ষায় ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে যান। কথিত আছে, তাঁর অবয়ব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল, তাই মুশরিকরা তাঁকে নবীজি মনে করে আক্রমণ করে। শত্রুপক্ষ তাঁর ডান হাত কেটে ফেললে তিনি নিমিষেই বাম হাতে পতাকা তুলে ধরেন।
যখন বাম হাতও কেটে ফেলা হলো, তখন তিনি ছিন্ন দুই বাহুর সাহায্যে পতাকাটিকে পাজর দিয়ে বুকে চেপে ধরেন, যাতে ইসলামের নিশান এক মুহূর্তের জন্যও ধুলোয় লুটিয়ে না পড়ে। অবশেষে ইবনে কিময়ার তীরের আঘাতে তিনি বীরের বেশে শাহাদাত বরণ করেন। সহীহ আল-বুখারি (হাদিস নং ১২৭৬, ৩৯১৪, ৪০৪৭) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ওহুদের যুদ্ধের শেষে তাঁকে দাফন করার সময় এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য অবলোকন করেন সাহাবায়ে কেরাম।
মক্কার এক সময়ের সবচেয়ে সুবেশধারী পুরুষটির বীরত্বপূর্ণ লাশের জন্য পর্যাপ্ত কাফনও জোটে নি। ছোট এক টুকরো চাদর দিয়ে মাথা ঢাকলে পা উন্মুক্ত হয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে আসত। এই করুণ দৃশ্য অবলোকন করে দয়ার নবী (সা.) অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন এবং সুরা আহজাবের ২৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন।
বুখারী ও মুসলিমের (হাদিস নং ৯৪০) বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সিদ্ধান্তে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর মাথা সেই চাদরটি দিয়ে ঢাকেন এবং পা 'ইযখির' নামক সুগন্ধি ঘাস দিয়ে আবৃত করে এই মহাসেনার দাফন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে প্রথিতযশা সাহাবী খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.) এই ত্যাগের কথা স্মরণ করে অশ্রুপাত করতেন এবং আক্ষেপ করে বলতেন যে, তাঁরা পরবর্তী জীবনে দুনিয়াবী অনেক নিয়ামত ও সম্পদ ভোগ করছেন, কিন্তু মুসআব (রা.) তাঁর সকল নেকি আখেরাতের নিরাপদ ভাণ্ডারের জন্য অক্ষত রেখে গেছেন এবং দুনিয়া থেকে রিক্ত হস্তে বিদায় নিয়েছেন। মুসআব ইবনে উমায়েরের (রা.) এই অনুপম জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, হকের পথে টিকে থাকতে বিলাসিতা ত্যাগ ও জান-মালের চরম উৎসর্গের বিনিময়েই আল্লাহর নূরের পূর্ণতা লাভ করা সম্ভব।
ইসলামের ইতিহাসে মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)-এর জীবন এক বিস্ময়কর ত্যাগের উপাখ্যান এবং আদর্শিক দৃঢ়তার নাম। মক্কার বনু আবদ আদ-দার বংশের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। মক্কার তরুণদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুশ্রী, মার্জিত এবং সুগন্ধি ব্যবহারের জন্য সুপরিচিত।
তাঁর পোশাক ও রাজকীয় বিলাসিতা ছিল সেকালের মক্কাবাসীদের আলোচনার প্রধান বিষয়। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ (৩য় খণ্ড) অনুযায়ী, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন যে, তিনি মক্কায় মুসআব অপেক্ষা আর কাউকে এত সুন্দর ও নেয়ামতপূর্ণ জীবনযাপন করতে দেখেননি। তবে এই দুনিয়াবী চাকচিক্য তাঁকে সত্যের পরম সন্ধান থেকে বিমুখ করতে পারেনি।
নবুয়তের প্রারম্ভিক যুগে যখন তাওহীদের দাওয়াত শুরু হলো, মুসআব (রা.) লোকচক্ষুর অন্তরালে দারুল আরকামে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত কোরআনের স্বর্গীয় বাণী শ্রবণ করেন এবং কালক্ষেপণ না করে ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসআবের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সংবাদ যখন তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছাল, বিশেষ করে তাঁর মা খুন্নাস বিনতে মালিক যখন এটি জানতে পারলেন, তখন শুরু হলো এক অসহনীয় নির্যাতনের অধ্যায়। তাঁর মা তাঁকে বন্দী করে রাখেন এবং এক পর্যায়ে তাঁর সমস্ত সম্পদ ও রাজকীয় পোশাক কেড়ে নেন।
The Test
এক সময়ের বিখ্যাত 'রাজপুত্র', যাঁর দেহ দামী রেশমি বসনে আবৃত থাকতো, ইসলামের খাতিরে তাঁকে তালি দেওয়া চট বা সাধারণ তন্তু দিয়ে নির্মিত খসখসে পোশাক পরিধান করতে হলো। কুরাইশদের এই ক্রমাগত ও অমানবিক নির্যাতনের মুখে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে তিনি প্রথম হিজরতে শরিক হয়ে সুদূর আবিসিনিয়ায় (হাবশায়) গমন করেন। সেখানে তিনি অভাব আর অনটনকে সাথী করে দিনাতিপাত করলেও ঈমানের নূরে তাঁর হৃদয় ছিল আলোকিত।
আবিসিনিয়া থেকে ফিরে আসার পর ইসলামের প্রসারে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা এক নতুন মাত্রা লাভ করে। প্রথম আকাবার শপথের পর মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) আনসাররা যখন নবীজির কাছে একজন ধর্মীয় শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার কথা জানালেন, তখন বিশ্বনবী (সা.) মুসআব ইবনে উমায়েরকে (রা.) মদিনার প্রথম 'রাষ্ট্রদূত' হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে নন, বরং মদিনাবাসীদের কাছে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও তাওহীদের বানী পৌঁছে দেওয়ার মহান লক্ষ্য নিয়ে সেই জনপদে পদার্পণ করেন।
মদিনায় তাঁর দাওয়াতী কৌশল ছিল আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর ও হিকমতপূর্ণ। তিনি প্রবীণ আনসার সাহাবী আস'আদ ইবনে জুরারাহ (রা.)-এর আতিথেয়তায় মেহমান হিসেবে থেকে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে প্রতিটি ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন। একদা মদিনার চরম ক্ষুব্ধ গোত্রপতি সা'দ ইবনে মুআদ এবং উসাইদ ইবনে হুদাইর যখন তলোয়ার হাতে তাঁকে বাধা দিতে আসলেন, মুসআব (রা.) বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে অত্যন্ত শান্ত স্বরে তাঁদের বললেন, 'যদি আপনারা অনুগ্রহ করে একটু বসেন এবং কথাগুলো শোনেন, যদি ভালো লাগে তবে গ্রহণ করবেন, আর যদি ভালো না লাগে তবে আমরা আপনাদের অপছন্দীয় কাজ থেকে ফিরে যাব এবং চলে আসব।' তাঁর এই সুশৃঙ্খল যুক্তি এবং সুললিত কণ্ঠে কোরআনের তেলাওয়াত শুনে তাঁদের রুদ্ধ হৃদয় খুলে যায় এবং সেখানেই তাঁরা ইসলাম কবুল করেন।
তাঁদের এই পরিবর্তনের প্রভাবে মদিনার বনু আব্দুল আশহাল গোত্রের প্রায় সকলেই ইসলামে দাখিল হয়। ফলস্বরূপ, মদিনার প্রতিটি অন্দরে ইসলামের বানী পৌঁছে যায় অতি অল্প সময়ে। দ্বিতীয় আকাবার শপথের সময় মুসআব (রা.) মদিনার পঁচাত্তর জন ঈমানদারের এক শক্তিশালী প্রতিনিধি দল নিয়ে মক্কায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তাঁর এই অবিস্মরণীয় সফলতার বিবরণ পেশ করেন, যা মূলত মদিনায় হিজরতের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
The Lesson
মদিনায় হিজরতের পরবর্তী সময়ে যখন ইসলামের সপক্ষে যুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষা শুরু হলো, মুসআব (রা.) সেখানেও নির্ভিক সিপাহসালারের পরিচয় দেন। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে তিনি মুহাজিরদের প্রধান পতাকাবাহী (আল-লিওয়া) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মাত্র এক বছর পর ওহুদের রণাঙ্গনেও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাতেই ইসলামের পবিত্র প্রধান ঝাণ্ডা তুলে দেন।
ওহুদের যুদ্ধের এক সন্ধিক্ষণে যখন মুসলিম বাহিনীর একাংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং মুশরিক বাহিনী পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালায়, তখন মুসআব (রা.) অটল পাহাড়ের মতো বীরত্বের সাথে ইসলামের নিশান আঁকড়ে ধরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রক্ষায় ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে যান। কথিত আছে, তাঁর অবয়ব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল, তাই মুশরিকরা তাঁকে নবীজি মনে করে আক্রমণ করে। শত্রুপক্ষ তাঁর ডান হাত কেটে ফেললে তিনি নিমিষেই বাম হাতে পতাকা তুলে ধরেন।
যখন বাম হাতও কেটে ফেলা হলো, তখন তিনি ছিন্ন দুই বাহুর সাহায্যে পতাকাটিকে পাজর দিয়ে বুকে চেপে ধরেন, যাতে ইসলামের নিশান এক মুহূর্তের জন্যও ধুলোয় লুটিয়ে না পড়ে। অবশেষে ইবনে কিময়ার তীরের আঘাতে তিনি বীরের বেশে শাহাদাত বরণ করেন। সহীহ আল-বুখারি (হাদিস নং ১২৭৬, ৩৯১৪, ৪০৪৭) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ওহুদের যুদ্ধের শেষে তাঁকে দাফন করার সময় এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য অবলোকন করেন সাহাবায়ে কেরাম।
মক্কার এক সময়ের সবচেয়ে সুবেশধারী পুরুষটির বীরত্বপূর্ণ লাশের জন্য পর্যাপ্ত কাফনও জোটে নি। ছোট এক টুকরো চাদর দিয়ে মাথা ঢাকলে পা উন্মুক্ত হয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে আসত। এই করুণ দৃশ্য অবলোকন করে দয়ার নবী (সা.) অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন এবং সুরা আহজাবের ২৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন।
বুখারী ও মুসলিমের (হাদিস নং ৯৪০) বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সিদ্ধান্তে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর মাথা সেই চাদরটি দিয়ে ঢাকেন এবং পা 'ইযখির' নামক সুগন্ধি ঘাস দিয়ে আবৃত করে এই মহাসেনার দাফন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে প্রথিতযশা সাহাবী খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.) এই ত্যাগের কথা স্মরণ করে অশ্রুপাত করতেন এবং আক্ষেপ করে বলতেন যে, তাঁরা পরবর্তী জীবনে দুনিয়াবী অনেক নিয়ামত ও সম্পদ ভোগ করছেন, কিন্তু মুসআব (রা.) তাঁর সকল নেকি আখেরাতের নিরাপদ ভাণ্ডারের জন্য অক্ষত রেখে গেছেন এবং দুনিয়া থেকে রিক্ত হস্তে বিদায় নিয়েছেন। মুসআব ইবনে উমায়েরের (রা.) এই অনুপম জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, হকের পথে টিকে থাকতে বিলাসিতা ত্যাগ ও জান-মালের চরম উৎসর্গের বিনিময়েই আল্লাহর নূরের পূর্ণতা লাভ করা সম্ভব।