Islamic Story
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ: মানবজাতির মুক্তির সনদ ও দ্বীনের পূর্ণতা
Can The Farewell Pilgrimage change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthens.
গল্পের শিক্ষা
বিদায় হজ্জের শিক্ষা হলো—ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান যা মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করে। সকল প্রকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে তাকওয়া এবং ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে একটি ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গঠন করাই মহানবী (সা.)-এর শেষ বার্তার মূল প্রতিপাদ্য।
Beginning
হিজরি দশম বর্ষে ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়, যা বিদায় হজ্জ নামে পরিচিত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় ঘোষণা করলেন যে তিনি হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় গমন করবেন। এই ঘোষণা শুনে মদিনা এবং এর আশপাশের অঞ্চল থেকে হাজার হাজার সাহাবী তাঁর সাথে যোগদানের জন্য সমবেত হন।
এটি ছিল ইসলামের বিজয়ের এক উজ্জ্বল মহূর্ত, যেখানে লক্ষাধিক মুমিন এক নেতার অধীনে তাওহীদের ঘোষণা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। জিলকদ মাসের ২৫ তারিখে মহানবী (সা.) এই বিশাল কাফেলার সাথে মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করেন। মদিনার নির্ধারিত মীকাত ‘যুল-হুলাইফাহ’ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি গোসল করেন এবং ইহরামের পোশাক পরিধান করেন।
সেখান থেকে তিনি এবং তাঁর সাহাবীগণ উচ্চকণ্ঠে তালবিয়া পাঠ করতে করতে মক্কার পথে অগ্রসর হন (সহীহ মুসলিম ১২১৮)। জিলহজ্জ মাসের ৪ তারিখে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি কাবার তাওয়াফ করেন এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ সম্পাদন করেন।
অষ্টম জিলহজ্জ তথা ইয়াউমুত তারবিয়াতে তিনি সকল সাহাবীসহ মিনায় গমন করেন এবং সেখানে রাত অতিবাহিত করেন। ৯ই জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর তিনি আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং সেখানে 'নামিরাহ' নামক স্থানে তাঁর জন্য একটি তাবু স্থাপন করা হয়। দুপুরের পর তিনি তাঁর প্রিয় উট ‘আল-কাসওয়া’-তে আরোহণ করে আরাফাতের সেই সুবিশাল ঐতিহাসিক প্রান্তরে লক্ষাধিক সাহাবীর সম্মুখে মহতি ভাষণ প্রদান করেন, যা মানবজাতির মুক্তির সনদ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর এই ভাষণে শুরুতেই মহান আল্লাহর উপযুক্ত প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেন। এরপর তিনি উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করে বলেন, “হে লোকসকল! আমার কথাগুলো গুরুত্বের সাথে শ্রবণ করো।
The Test
আমি জানি না আজ থেকে আর কখনো আমি তোমাদের মাঝে এই স্থানে উপস্থিত হতে পারব কি না।” এই সূচনার মাধ্যমে তিনি মূলত এই সফরের বিদায়ী ইঙ্গিত প্রদান করেন, যা উপস্থিত সাহাবীদের হৃদয়ে গভীর অনুভূতির সৃষ্টি করে। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঘোষণা করেন যে, আজকের এই দিনটি যেমন পবিত্র, এই মাসটি যেমন সম্মানিত এবং এই শহর (মক্কা) যেমন নিরাপদ; তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের একে অপরের মান-সম্মানও আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত তেমনি পবিত্র ও নিরাপদ গণ্য হবে (সহীহ বুখারী ১৭৪১, ৪৪০৩)। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন যে, এক মুসলিমের জান-মাল অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।
রাসূল (সা.) তাঁর ভাষণে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগের সকল কুসংস্কার ও অন্যায় প্রথাকে তাঁর দুই পায়ের নিচে পদদলিত করে বাতিলের ঘোষণা দেন। বিশেষ করে জাহিলি যুগের বংশীয় রক্তপাতের যে ধারা প্রচলিত ছিল, তা তিনি চিরতরে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং নিজের গোত্র বনু হাশিমের ইবনু রাবিয়া বিন হারিসের খুনের দাবি মওকুফ করার মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দেন যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং ক্ষমা ও সহনশীলতাই ইসলামের মূল ভিত্তি।
অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে জঘন্য হাতিয়ার 'রিবা' বা সুদের প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, জাহিলি যুগের সমস্ত সুদী ব্যবস্থা আজ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হলো। তিনি প্রথমেই নিজ চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের পাওনা সমস্ত সুদের দাবি বাতিল করে দেন।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবতার জয়গান গেয়ে তিনি নারীদের অধিকার সম্পর্কে উম্মতকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, “হে লোকসকল!
তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদের সাথে তোমাদের সম্পর্ক বৈধ হয়েছে।” তিনি নারীদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দেন এবং শরিয়ত নির্ধারিত তাদের প্রাপ্য অধিকার প্রদানের কঠোর তাগিদ দেন। রাসূল (সা.) ইসলামের বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের এক কালজয়ী ধারণা পেশ করেন।
তিনি ঘোষণা করেন যে, সকল মুসলিম একে অপরের ভাই। তিনি বর্ণবাদ এবং আভিজাত্যের দম্ভ চূর্ণ করে দিয়ে বলেন যে, আরবের ওপর কোনো অনারবের কিংবা অনারবের ওপর কোনো আরবের, সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো মহান আল্লাহর প্রতি ভীতি বা তাকওয়া। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন।
ভাষণের এক পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) উপস্থিত জনতার নিকট হাশরের ময়দানের জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করেন, “আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি? তোমরা আমার সম্পর্কে কী সাক্ষ্য দেবে?” উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম একসাথে লক্ষ কণ্ঠে উচ্চস্বরে সাক্ষ্য দিলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি আপনার আমানত আদায় করেছেন এবং মহান আল্লাহর রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন।” তখন রাসূল (সা.) আকাশের দিকে শাহাদাত আঙুলি উত্তোলন করে এবং তা জনগণের দিকে ঝুঁকিয়ে তিনবার প্রার্থনা করলেন, “হে আল্লাহ!
The Lesson
আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।” এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণেই জিলহজ্জের এই পবিত্র দিনে আরাফাতের ময়দানে জোহরের নামাজের সময় মহানুভব আল্লাহর পক্ষ থেকে সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতটি অবতীর্ণ হয়: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম” (ইবনে কাসীর)।
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রেরিত জীবন বিধানের পূর্ণতা তসদিক করেন। এটি ছিল ইসলামের বিজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা। আরাফাতের অবস্থান শেষে সূর্যাস্তের পর মহানবী (সা.) ধীরস্থিরভাবে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
সেখানে তিনি মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায় করেন এবং রাত অতিবাহিত করেন। পরদিন ১০ই জিলহজ্জ মিনা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং জিলহজ্জের প্রধান কার্যাবলি সম্পাদন করেন। তিনি বড় শয়তানকে লক্ষ্য করে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ বা জামারাতে পাথর মারেন।
এরপর তিনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁর কুরবানি সম্পাদন করেন এবং নিজের মাথা মুণ্ডন করেন। এরপর তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে তওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করেন। হজ্জের এই আহকামসমূহ সমাপ্ত করার পর তিনি বিদায়ী তাওয়াফ সম্পাদন করেন এবং সাহাবীদের নিয়ে ফিরে যান (সহীহ বুখারী ৪৪০৬)।
মহানবী (সা.)-এর এই বিদায় হজ্জ ও চূড়ান্ত ভাষণ ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার প্রতিফলন। এটি কেবল হজ্জের নিয়মাবলী শিক্ষা দেয়নি, বরং মানবতা, সমতা, নারী অধিকার, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এবং তাকওয়ার ভিত্তিতে একটি আদর্শিক রাষ্ট্র গঠনের দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যারা আজ এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এই বাণী পৌঁছে দেয়।
তাঁর সেই নির্দেশের ফলেই আজ ইসলামের এই শ্বাশ্বত বাণী বিশ্বের কোণায় কোণায় পৌঁছে গেছে। বিদায় হজ্জ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি প্রেরণার উৎস, যা কিয়ামত পর্যন্ত সঠিক পথের দিশা প্রদান করবে।
হিজরি দশম বর্ষে ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়, যা বিদায় হজ্জ নামে পরিচিত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় ঘোষণা করলেন যে তিনি হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় গমন করবেন। এই ঘোষণা শুনে মদিনা এবং এর আশপাশের অঞ্চল থেকে হাজার হাজার সাহাবী তাঁর সাথে যোগদানের জন্য সমবেত হন।
এটি ছিল ইসলামের বিজয়ের এক উজ্জ্বল মহূর্ত, যেখানে লক্ষাধিক মুমিন এক নেতার অধীনে তাওহীদের ঘোষণা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। জিলকদ মাসের ২৫ তারিখে মহানবী (সা.) এই বিশাল কাফেলার সাথে মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করেন। মদিনার নির্ধারিত মীকাত ‘যুল-হুলাইফাহ’ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি গোসল করেন এবং ইহরামের পোশাক পরিধান করেন।
সেখান থেকে তিনি এবং তাঁর সাহাবীগণ উচ্চকণ্ঠে তালবিয়া পাঠ করতে করতে মক্কার পথে অগ্রসর হন (সহীহ মুসলিম ১২১৮)। জিলহজ্জ মাসের ৪ তারিখে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি কাবার তাওয়াফ করেন এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ সম্পাদন করেন।
অষ্টম জিলহজ্জ তথা ইয়াউমুত তারবিয়াতে তিনি সকল সাহাবীসহ মিনায় গমন করেন এবং সেখানে রাত অতিবাহিত করেন। ৯ই জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর তিনি আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং সেখানে 'নামিরাহ' নামক স্থানে তাঁর জন্য একটি তাবু স্থাপন করা হয়। দুপুরের পর তিনি তাঁর প্রিয় উট ‘আল-কাসওয়া’-তে আরোহণ করে আরাফাতের সেই সুবিশাল ঐতিহাসিক প্রান্তরে লক্ষাধিক সাহাবীর সম্মুখে মহতি ভাষণ প্রদান করেন, যা মানবজাতির মুক্তির সনদ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর এই ভাষণে শুরুতেই মহান আল্লাহর উপযুক্ত প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেন। এরপর তিনি উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করে বলেন, “হে লোকসকল! আমার কথাগুলো গুরুত্বের সাথে শ্রবণ করো।
The Test
আমি জানি না আজ থেকে আর কখনো আমি তোমাদের মাঝে এই স্থানে উপস্থিত হতে পারব কি না।” এই সূচনার মাধ্যমে তিনি মূলত এই সফরের বিদায়ী ইঙ্গিত প্রদান করেন, যা উপস্থিত সাহাবীদের হৃদয়ে গভীর অনুভূতির সৃষ্টি করে। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঘোষণা করেন যে, আজকের এই দিনটি যেমন পবিত্র, এই মাসটি যেমন সম্মানিত এবং এই শহর (মক্কা) যেমন নিরাপদ; তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের একে অপরের মান-সম্মানও আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত তেমনি পবিত্র ও নিরাপদ গণ্য হবে (সহীহ বুখারী ১৭৪১, ৪৪০৩)। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন যে, এক মুসলিমের জান-মাল অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।
রাসূল (সা.) তাঁর ভাষণে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগের সকল কুসংস্কার ও অন্যায় প্রথাকে তাঁর দুই পায়ের নিচে পদদলিত করে বাতিলের ঘোষণা দেন। বিশেষ করে জাহিলি যুগের বংশীয় রক্তপাতের যে ধারা প্রচলিত ছিল, তা তিনি চিরতরে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং নিজের গোত্র বনু হাশিমের ইবনু রাবিয়া বিন হারিসের খুনের দাবি মওকুফ করার মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দেন যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং ক্ষমা ও সহনশীলতাই ইসলামের মূল ভিত্তি।
অর্থনৈতিক শোষণের সবচেয়ে জঘন্য হাতিয়ার 'রিবা' বা সুদের প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, জাহিলি যুগের সমস্ত সুদী ব্যবস্থা আজ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হলো। তিনি প্রথমেই নিজ চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের পাওনা সমস্ত সুদের দাবি বাতিল করে দেন।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবতার জয়গান গেয়ে তিনি নারীদের অধিকার সম্পর্কে উম্মতকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, “হে লোকসকল!
তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদের সাথে তোমাদের সম্পর্ক বৈধ হয়েছে।” তিনি নারীদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দেন এবং শরিয়ত নির্ধারিত তাদের প্রাপ্য অধিকার প্রদানের কঠোর তাগিদ দেন। রাসূল (সা.) ইসলামের বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের এক কালজয়ী ধারণা পেশ করেন।
তিনি ঘোষণা করেন যে, সকল মুসলিম একে অপরের ভাই। তিনি বর্ণবাদ এবং আভিজাত্যের দম্ভ চূর্ণ করে দিয়ে বলেন যে, আরবের ওপর কোনো অনারবের কিংবা অনারবের ওপর কোনো আরবের, সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো মহান আল্লাহর প্রতি ভীতি বা তাকওয়া। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন।
ভাষণের এক পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) উপস্থিত জনতার নিকট হাশরের ময়দানের জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করেন, “আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি? তোমরা আমার সম্পর্কে কী সাক্ষ্য দেবে?” উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম একসাথে লক্ষ কণ্ঠে উচ্চস্বরে সাক্ষ্য দিলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি আপনার আমানত আদায় করেছেন এবং মহান আল্লাহর রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন।” তখন রাসূল (সা.) আকাশের দিকে শাহাদাত আঙুলি উত্তোলন করে এবং তা জনগণের দিকে ঝুঁকিয়ে তিনবার প্রার্থনা করলেন, “হে আল্লাহ!
The Lesson
আপনি সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।” এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণেই জিলহজ্জের এই পবিত্র দিনে আরাফাতের ময়দানে জোহরের নামাজের সময় মহানুভব আল্লাহর পক্ষ থেকে সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতটি অবতীর্ণ হয়: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম” (ইবনে কাসীর)।
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রেরিত জীবন বিধানের পূর্ণতা তসদিক করেন। এটি ছিল ইসলামের বিজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা। আরাফাতের অবস্থান শেষে সূর্যাস্তের পর মহানবী (সা.) ধীরস্থিরভাবে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
সেখানে তিনি মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায় করেন এবং রাত অতিবাহিত করেন। পরদিন ১০ই জিলহজ্জ মিনা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং জিলহজ্জের প্রধান কার্যাবলি সম্পাদন করেন। তিনি বড় শয়তানকে লক্ষ্য করে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ বা জামারাতে পাথর মারেন।
এরপর তিনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁর কুরবানি সম্পাদন করেন এবং নিজের মাথা মুণ্ডন করেন। এরপর তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে তওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করেন। হজ্জের এই আহকামসমূহ সমাপ্ত করার পর তিনি বিদায়ী তাওয়াফ সম্পাদন করেন এবং সাহাবীদের নিয়ে ফিরে যান (সহীহ বুখারী ৪৪০৬)।
মহানবী (সা.)-এর এই বিদায় হজ্জ ও চূড়ান্ত ভাষণ ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার প্রতিফলন। এটি কেবল হজ্জের নিয়মাবলী শিক্ষা দেয়নি, বরং মানবতা, সমতা, নারী অধিকার, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এবং তাকওয়ার ভিত্তিতে একটি আদর্শিক রাষ্ট্র গঠনের দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যারা আজ এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এই বাণী পৌঁছে দেয়।
তাঁর সেই নির্দেশের ফলেই আজ ইসলামের এই শ্বাশ্বত বাণী বিশ্বের কোণায় কোণায় পৌঁছে গেছে। বিদায় হজ্জ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি প্রেরণার উৎস, যা কিয়ামত পর্যন্ত সঠিক পথের দিশা প্রদান করবে।