Islamic Story

আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ: উম্মতের বিশ্বস্ত আমিনের বীরত্বগাথা

Can Abu Ubaidah ibn al-Jarrah change your heart today? Discover faith, patience, and trust in Allah in a Quran-based story that stirs reflection and strengthe.

আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ: উম্মতের বিশ্বস্ত আমিনের বীরত্বগাথা

গল্পের শিক্ষা

আবু উবাইদাহ (রা.)-এর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি যে, পদের মহত্ত্ব অপেক্ষা আমানতদারিতা ও বিনয় বড়। একজন প্রকৃত নেতা সর্বদা তার অধীনস্থদের পাশে বিপদ-আপদে অটল থাকেন এবং পার্থিব সম্পদ নয় বরং আখেরাতের কল্যাণকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেন।

Beginning

ইসলামের ইতিহাসে যে ক’জন মহান ব্যক্তিত্ব নিজেদের জীবন, সম্পদ এবং মেধা দিয়ে আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করেছেন, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.) তাদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের ফিহর গোত্রের সন্তান। আবু বকর আল-সিদ্দিক (রা.)-এর দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামের সূচনালগ্নেই তিনি ঈমানের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

তার জীবনের প্রতিটি বাঁকে মিশে আছে এক অটল বিশ্বাস, অবিশ্বাস্য আমানতদারিতা এবং চরম বিনয়। **ঈমানের দৃঢ়তা ও সূরা আল-মুজাদালার পটভূমি:** মক্কার কাফিরদের অকথ্য নির্যাতনের মুখেও আবু উবাইদাহ (রা.) ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। হাফিজ ইবনে কাসীর তার বিখ্যাত ‘আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ’ (৭ম খণ্ড) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মুজাদালার ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে বিশেষ শ্রেণির মুমিনদের প্রশংসা করেছেন, আবু উবাইদাহ (রা.) তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: “তুমি পাবে না এমন কোনো কওম যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, অথচ তারা ভালোবাসে তাদেরকে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে—হোক না তারা তাদের বাবা, সন্তান, ভাই অথবা আত্মীয়-স্বজন।” বদরের যুদ্ধে আবু উবাইদাহ (রা.)-এর ভূমিকা এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। যখন তার নিজের পিতা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয় এবং বারবার তাকে হত্যার চেষ্টা চালায়, তখন আবু উবাইদাহ (রা.) ঈমানের দাবিতে পরম করুণাময় আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাকে রক্তসম্পর্কের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। ইবনে কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তার এই অনন্য ত্যাগের ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য সত্যনিষ্ঠার প্রেরণা হয়ে থাকবে।

**উহুদের ময়দানে আত্মত্যাগ ও সহীহ বুখারীর বর্ণনা:** উহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) শারীরিকভাবে মারাত্মক আহত হন, তখন আবু উবাইদাহ (রা.)-এর ভালোবাসা এক অনন্য উচ্চতায় প্রকাশ পায়। সহীহ বুখারী এবং ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুসারে, কুরাইশদের ছোঁড়া পাথরের আঘাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র চেহারায় লোহার শিরস্ত্রাণের (হেলমেট) দুটি কড়া গেঁথে গিয়েছিল। আবু উবাইদাহ (রা.) তা দেখতে পেয়ে দ্রুত পাশে আসেন।

The Test

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন হাত দিয়ে টানলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশি কষ্ট পাবেন, তাই তিনি নিজের দাঁত দিয়ে কড়া দুটি টেনে বের করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম কড়াটি বের করার সময় তার সামনের একটি দাঁত উপড়ে যায়, এবং দ্বিতীয়টির সময় আরও একটি দাঁত ভেঙে যায়। রক্তে রঞ্জিত হয়েও তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কষ্ট লাঘব করতে পেরেছিলেন বলেই খুশি ছিলেন।
তিনি কেবল একজন দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন না, বরং রাসুলের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধে তিনি ছিলেন আত্মোৎসর্গকারী। এই ঘটনার পর তার চেহারার উজ্জ্বলতা ও সৌন্দর্য দন্তহীনতা সত্ত্বেও আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেন। **আমানতদারিতার স্বীকৃতি: উম্মতের আমীন:** আবু উবাইদাহ (রা.)-এর আমানতদারিতা বা বিশ্বস্ততা ছিল স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক সত্যায়িত।

সহীহ বুখারী (হাদিস নম্বর ৩৭৪৪ ও ৩৭৪৫) এবং সহীহ মুসলিম (হাদিস নম্বর ২৪১৯)-এ বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “প্রত্যেক উম্মতের একজন বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি (আমীন) থাকে, আর এই উম্মতের আমীন হলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ।” এই উপাধিটি কেবল একটি নাম ছিল না, বরং তার সামগ্রিক চরিত্রের সারসংক্ষেপ ছিল। ইবনে কাসীর বর্ণনা করেন, একবার নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এমন একজন ব্যক্তিকে চাইলেন যিনি তাদের বিবাদ মীমাংসা ও বিচার করতে পারেন, তখন রাসুল (সা.) বলেছিলেন, “আমি তোমাদের সাথে এমন একজন সত্যনিষ্ঠ ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত লোককে পাঠাবো, যে প্রকৃতপক্ষেই বিশ্বস্ত।” অতঃপর তিনি আবু উবাইদাহ (রা.)-কে তাদের সাথে পাঠিয়েছিলেন। হযরত উমর (রা.) বলেন, “সেদিন আমি ইবাদতের চেয়েও নেতৃত্বের লোভ করেছিলাম এই আশায় যে, আমি হয়তো সেই ‘বিশ্বস্ত’ ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত হবো যাঁকে রাসুল (সা.) প্রশংসা করেছেন।” **শামের প্রধান সেনাপতি ও উমর (রা.)-এর আমল:** খলিফা আবু বকর (রা.) এবং খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনকালে আবু উবাইদাহ (রা.) ইসলামের ভূখণ্ড বিস্তারে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন।

ইবনে কাসীরের ‘আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ’ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়ারমুকের ঐতিহাসিক যুদ্ধে তার সামরিক প্রজ্ঞা ছিল অনবদ্য। খলিফা উমর (রা.) যখন রণকৌশলগত কারণে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর পরিবর্তে আবু উবাইদাহ (রা.)-কে শামের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন, তখন তিনি যে বিনয় প্রদর্শন করেছিলেন তা ইতিহাসে বিরল। তিনি সেনাপতির পত্রটি কিছুকাল গোপন রেখেছিলেন যাতে যুদ্ধের ময়দানে থাকা সৈন্যদের মনোবল নষ্ট না হয় এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) লজ্জিত না হন।

পরবর্তীতে তিনি খালিদ (রা.)-কে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেছিলেন, “আমি দুনিয়ার ক্ষমতার জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করছি।” তাদের মধ্যকার এই ভ্রাতৃত্ববোধ ও পদের প্রতি নির্লিপ্ততা ইসলামের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। **খলিফা উমর (রা.)-এর কান্না ও আবু উবাইদাহর কুটির:** আবু উবাইদাহ (রা.) ছিলেন তৎকালীন শামের গভর্নর এবং লক্ষাধিক সৈন্যের প্রধান সেনাপতি, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অকল্পনীয় সাদামাটা। ইবনে কাসীর বর্ণনা করেন, খলিফা উমর (রা.) যখন সিরিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফরে যান, তখন তিনি আবু উবাইদাহ (রা.)-এর ঘরে মেহমান হতে চান।

ঘরে প্রবেশ করে খলিফা দেখলেন শামের এই প্রতাপশালী শাসকের আসবাবপত্র বলতে কেবল একটি তরবারি, একটি ঢাল এবং একটি সাধারণ চাদর যা তিনি শোয়ার কাজে ব্যবহার করতেন। খলিফা উমর (রা.) বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু উবাইদাহ! আপনার জন্য কি কিছু ঘরের আসবাবের ব্যবস্থা করা যেত না?” আবু উবাইদাহ (রা.) মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “হে আমিরুল মুমিনীন!

The Lesson

এগুলোই তো আমাদের আখিরাতের যাত্রায় পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট।” উমর (রা.) এই উত্তর শুনে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, “হে আবু উবাইদাহ! দুনিয়া ও এর চাকচিক্য আমাদের সকলকেই কোনো না কোনোভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে, কিন্তু আপনি যেমন রাসুলের যুগে ছিলেন, আজও তেমনই অটুট রয়ে গেছেন।” **আমওয়াসের মহামারী ও শাহাদাত:** হিজরি ১৮ সালে শাম অঞ্চলে ‘আমওয়াস’ নামক এক ভয়াবহ প্লেগ মড়ক দেখা দেয়। ইবনে কাসীরের বর্ণনা মতে, এই মহামারীতে বহু সাহাবী ও হাজার হাজার মুসলমান প্রাণ হারান।

খলিফা উমর (রা.) তার প্রিয় আবু উবাইদাহকে এই বিপদ থেকে বাঁচাতে চাইলেন। তিনি তাকে মদিনায় তলব করে একটি জরুরি চিঠি পাঠান। কিন্তু আবু উবাইদাহ (রা.) তো ছিলেন সাধারণ সৈন্যদের ব্যথায় ব্যথিত এক নেতা।

তিনি খলিফাকে বিনীতভাবে ফিরতি চিঠিতে লিখলেন, “আমি আমার সৈন্যদের মাঝে অবস্থান করছি। আল্লাহর ফয়সালা যা আছে আমি তাই মেনে নেব। আমি তাদেরকে ফেলে একা নিজের জীবন বাঁচাতে চাই না।

আমাকে আপনার নির্দেশ থেকে অব্যাহতি দিন।” অবশেষে এই মহান সেনাপতি নিজেও মহামারীতে আক্রান্ত হন। মৃত্যুশয্যায় তিনি তার উত্তরসূরিদের উপদেশ দিয়েছিলেন নামাজ কায়েম রাখতে, নফল রোজা রাখতে এবং সর্বদা সত্য কথা বলতে। **পরিশেষ:** আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর সমগ্র জীবন ছিল আনুগত্য, সততা এবং কঠোর আমানতদারিতার এক জীবন্ত উপাখ্যান।

তিনি সেই ১০ জন মহাসৌভাগ্যবান সাহাবীর একজন (আশারায়ে মুবাশশারা), যাঁদেরকে রাসুলুল্লাহ (সা.) দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। পদের মোহ কিংবা বিজয়ী বীরের অহংকার তাকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব, যাকে উমর (রা.) তার মৃত্যুর সময় খলিফা হিসেবে মনোনীত করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন এই বলে— “আবু উবাইদাহ বেঁচে থাকলে আমি তাকেই খলিফা নির্বাচন করতাম, কারণ আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি সে এই উম্মতের আমীন।” আবু উবাইদাহ (রা.)-এর আদর্শ আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য বিনয় ও নিঃস্বার্থ সেবার অনন্য মানদণ্ড।